নোয়াখালীতে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে হামের প্রকোপ। জেলার একমাত্র বিশেষায়িত হাম ওয়ার্ডে রোগীর চাপ কয়েকগুণ বেড়ে যাওয়ায় শয্যা, জনবল ও চিকিৎসাসেবা নিয়ে চরম সংকট তৈরি হয়েছে।
১৭ শয্যার হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে বর্তমানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ১১১ জন রোগী। এতে ওয়ার্ডের ভেতরে-বাইরে, এমনকি মেঝে ও চলাচলের পথেও রোগী ও স্বজনদের অবস্থান করতে হচ্ছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, অতিরিক্ত রোগীর চাপে ওয়ার্ডে তিল ধারণের জায়গা নেই। বাথরুম সংকট, দুর্গন্ধ এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে শিশুদের সঙ্গে থাকা স্বজনদেরও অসুস্থ হয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতলে অতিরিক্ত রোগীর চাপে হাসপাতালের ওয়ার্ডে জায়গা নেই। বাথরুম সংকট, দুর্গন্ধ এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে শিশুদের সঙ্গে থাকা স্বজনদেরও অসুস্থ হয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে আরও ৩৭ জন হামের রোগী ভর্তি হয়েছেন। বর্তমানে আইসোলেশন ওয়ার্ডে মোট ১১১ জন চিকিৎসাধীন রয়েছেন। একই সময়ে চিকিৎসা শেষে বাড়ি ফিরেছেন ৫৭ জন।
চলমান প্রাদুর্ভাবে এ পর্যন্ত হাসপাতালটিতে চারজন রোগীর মৃত্যু হয়েছে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘদিনের জনবল সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। পরিচ্ছন্নতাকর্মীর ৩০টি পদের মধ্যে ৮টি শূন্য রয়েছে। এছাড়া সিনিয়র কনসালটেন্টের ১০টি পদের মধ্যে ৬টি, সিনিয়র স্টাফ নার্সের ২১টি, স্টাফ নার্সের ৬টি এবং মিডওয়াইফ নার্সের ৩টি পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে। ফলে চিকিৎসাসেবা ও পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
রোগীদের স্বজনদের অভিযোগ, সীমিত জায়গায় রোগীদের পাশাপাশি কয়েক শতাধিক স্বজন অবস্থান করায় পরিবেশ আরও নাজুক হয়ে উঠেছে। তারা দ্রুত শয্যা সংখ্যা বৃদ্ধি ও প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগের দাবি জানিয়েছেন।
সুবর্ণচর উপজেলার রোকেয়া বেগম বলেন, গত ২৪ জুন থেকে ছেলেকে নিয়ে হাসপাতালে আছি। শয্যা না পেয়ে স্বামীসহ মেঝেতে থাকতে হচ্ছে।”
লক্ষ্মীপুরের রামগতি থেকে আসা জাকির হোসেন বলেন, তিন দিন ধরে হাসপাতালে আছি। প্রতিদিনই নতুন রোগী আসছে। সীমিত জনবল নিয়ে চিকিৎসক ও নার্সরা হিমশিম খাচ্ছেন।
কবিরহাট উপজেলার ধানশালিক ইউনিয়নের রোকসানা আক্তার জানান, তার চার বছরের মেয়ে চিকিৎসায় সুস্থতার পথে থাকলেও হাসপাতালের পরিবেশ অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর।
সচেতন মহলের মতে, হাসপাতালের নবনির্মিত সাততলা ভবনটি এখনো পুরোপুরি চালু না হওয়ায় শয্যা সংকট আরও তীব্র হয়েছে। নতুন ভবন চালু হলে আবাসন সংকট কিছুটা কমবে, তবে জনবল সংকট দূর না হলে সেবার মান উন্নয়ন সম্ভব হবে না।
নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. রাজিব আহম্মেদ চৌধুরী বলেন, ১৭টি বেডের বিপরীতে ১১১ জন রোগী ভর্তি থাকলে স্বাভাবিকভাবেই পরিবেশ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। গত আড়াই মাস ধরে দুজন চিকিৎসক ও দুজন সিনিয়র স্টাফ নার্স নিরবচ্ছিন্নভাবে দায়িত্ব পালন করছেন। সম্প্রতি আরও দুজন নার্স যুক্ত করা হলেও বর্তমান রোগীর চাপ সামাল দিতে জরুরি ভিত্তিতে জনবল বৃদ্ধি প্রয়োজন।
হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত তত্ত্বাবধায়ক ডা. আনোয়ার হোসেন বলেন, নোয়াখালীর ৯টি উপজেলার পাশাপাশি লক্ষ্মীপুরের রামগতি, চন্দ্রগঞ্জসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকেও রোগীরা এখানে চিকিৎসা নিতে আসেন। ফলে সবসময়ই রোগীর চাপ বেশি থাকে। সীমিত জনবল ও সম্পদ নিয়েই আমরা সর্বোচ্চ সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছি।
উল্লেখ্য, গত ১৬ জুন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতাল আকস্মিক পরিদর্শন করেন।
পরিদর্শনে নানা অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা দেখতে পেয়ে তিনি তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ককে প্রত্যাহার করেন এবং তদন্তে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করেন।
পরে নোয়াখালীর সিভিল সার্জন ডা. আনোয়ার হোসেনকে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়কের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়।

মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ৩০ জুন ২০২৬
নোয়াখালীতে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে হামের প্রকোপ। জেলার একমাত্র বিশেষায়িত হাম ওয়ার্ডে রোগীর চাপ কয়েকগুণ বেড়ে যাওয়ায় শয্যা, জনবল ও চিকিৎসাসেবা নিয়ে চরম সংকট তৈরি হয়েছে।
১৭ শয্যার হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে বর্তমানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ১১১ জন রোগী। এতে ওয়ার্ডের ভেতরে-বাইরে, এমনকি মেঝে ও চলাচলের পথেও রোগী ও স্বজনদের অবস্থান করতে হচ্ছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, অতিরিক্ত রোগীর চাপে ওয়ার্ডে তিল ধারণের জায়গা নেই। বাথরুম সংকট, দুর্গন্ধ এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে শিশুদের সঙ্গে থাকা স্বজনদেরও অসুস্থ হয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতলে অতিরিক্ত রোগীর চাপে হাসপাতালের ওয়ার্ডে জায়গা নেই। বাথরুম সংকট, দুর্গন্ধ এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে শিশুদের সঙ্গে থাকা স্বজনদেরও অসুস্থ হয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে আরও ৩৭ জন হামের রোগী ভর্তি হয়েছেন। বর্তমানে আইসোলেশন ওয়ার্ডে মোট ১১১ জন চিকিৎসাধীন রয়েছেন। একই সময়ে চিকিৎসা শেষে বাড়ি ফিরেছেন ৫৭ জন।
চলমান প্রাদুর্ভাবে এ পর্যন্ত হাসপাতালটিতে চারজন রোগীর মৃত্যু হয়েছে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘদিনের জনবল সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। পরিচ্ছন্নতাকর্মীর ৩০টি পদের মধ্যে ৮টি শূন্য রয়েছে। এছাড়া সিনিয়র কনসালটেন্টের ১০টি পদের মধ্যে ৬টি, সিনিয়র স্টাফ নার্সের ২১টি, স্টাফ নার্সের ৬টি এবং মিডওয়াইফ নার্সের ৩টি পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে। ফলে চিকিৎসাসেবা ও পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
রোগীদের স্বজনদের অভিযোগ, সীমিত জায়গায় রোগীদের পাশাপাশি কয়েক শতাধিক স্বজন অবস্থান করায় পরিবেশ আরও নাজুক হয়ে উঠেছে। তারা দ্রুত শয্যা সংখ্যা বৃদ্ধি ও প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগের দাবি জানিয়েছেন।
সুবর্ণচর উপজেলার রোকেয়া বেগম বলেন, গত ২৪ জুন থেকে ছেলেকে নিয়ে হাসপাতালে আছি। শয্যা না পেয়ে স্বামীসহ মেঝেতে থাকতে হচ্ছে।”
লক্ষ্মীপুরের রামগতি থেকে আসা জাকির হোসেন বলেন, তিন দিন ধরে হাসপাতালে আছি। প্রতিদিনই নতুন রোগী আসছে। সীমিত জনবল নিয়ে চিকিৎসক ও নার্সরা হিমশিম খাচ্ছেন।
কবিরহাট উপজেলার ধানশালিক ইউনিয়নের রোকসানা আক্তার জানান, তার চার বছরের মেয়ে চিকিৎসায় সুস্থতার পথে থাকলেও হাসপাতালের পরিবেশ অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর।
সচেতন মহলের মতে, হাসপাতালের নবনির্মিত সাততলা ভবনটি এখনো পুরোপুরি চালু না হওয়ায় শয্যা সংকট আরও তীব্র হয়েছে। নতুন ভবন চালু হলে আবাসন সংকট কিছুটা কমবে, তবে জনবল সংকট দূর না হলে সেবার মান উন্নয়ন সম্ভব হবে না।
নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. রাজিব আহম্মেদ চৌধুরী বলেন, ১৭টি বেডের বিপরীতে ১১১ জন রোগী ভর্তি থাকলে স্বাভাবিকভাবেই পরিবেশ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। গত আড়াই মাস ধরে দুজন চিকিৎসক ও দুজন সিনিয়র স্টাফ নার্স নিরবচ্ছিন্নভাবে দায়িত্ব পালন করছেন। সম্প্রতি আরও দুজন নার্স যুক্ত করা হলেও বর্তমান রোগীর চাপ সামাল দিতে জরুরি ভিত্তিতে জনবল বৃদ্ধি প্রয়োজন।
হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত তত্ত্বাবধায়ক ডা. আনোয়ার হোসেন বলেন, নোয়াখালীর ৯টি উপজেলার পাশাপাশি লক্ষ্মীপুরের রামগতি, চন্দ্রগঞ্জসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকেও রোগীরা এখানে চিকিৎসা নিতে আসেন। ফলে সবসময়ই রোগীর চাপ বেশি থাকে। সীমিত জনবল ও সম্পদ নিয়েই আমরা সর্বোচ্চ সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছি।
উল্লেখ্য, গত ১৬ জুন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতাল আকস্মিক পরিদর্শন করেন।
পরিদর্শনে নানা অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা দেখতে পেয়ে তিনি তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ককে প্রত্যাহার করেন এবং তদন্তে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করেন।
পরে নোয়াখালীর সিভিল সার্জন ডা. আনোয়ার হোসেনকে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়কের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়।

আপনার মতামত লিখুন