ডি এস কে টিভি চ্যানেল
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ১০ জুলাই ২০২৫

হাইকোর্টের বেঞ্চগুলো বিভাগীয় পর্যায়ে যায় মারাত্মক আকারে দূর্ণীতি হবে।

হাইকোর্টের বেঞ্চগুলো বিভাগীয় পর্যায়ে যায় মারাত্মক আকারে দূর্ণীতি হবে।
হাইকোর্টের বেঞ্চ ঢাকার বাইরে বিভাগীয় শহরে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তাবটা বেশ কিছুদিন ধরেই আলোচনায় আছে। এর পক্ষে যারা বলছেন, তাদের যুক্তি হলো—এতে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় বিচার পৌঁছে যাবে, কষ্ট কমবে। কিন্তু ছবিটা কি আসলেই এতটা সহজ? একজন আইনজীবী হিসেবে আমি এই প্রস্তাবের পেছনে কিছু গুরুতর ঝুঁকির আভাস পাচ্ছি। আমার নাম সবুজ খাঁন, এবং আজ আমি আপনাদের সামনে তুলে ধরব, কেন এই আপাতদৃষ্টিতে ভালো উদ্যোগটি আসলে দুর্নীতির এক নতুন দুয়ার খুলে দিতে পারে। এটা তো আমরা সবাই জানি যে আমাদের বিচার ব্যবস্থায় মামলার জট একটা বিরাট সমস্যা। লক্ষ লক্ষ মামলা ঝুলে আছে, আর একটা রায়ের জন্য মানুষকে বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হয়। এর একটা বড় কারণ হিসেবে দেখানো হয়, আমাদের বিচার ব্যবস্থা পুরোপুরি ঢাকাকেন্দ্রিক। দেশের একমাত্র সুপ্রিম কোর্ট আর তার হাইকোর্ট বিভাগ রাজধানীতে হওয়ায় পঞ্চগড় বা বান্দরবানের মতো দূরবর্তী এলাকার একজন মানুষকেও সামান্য আইনি প্রতিকারের জন্য শত শত কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে ঢাকায় আসতে হয়। এই যাতায়াত, থাকা-খাওয়া আর আইনজীবীর খরচ যোগানো অনেকের জন্যই প্রায় অসম্ভব। ফলে বহু মানুষ বাধ্য হয়ে ন্যায়বিচার চাওয়ার আশাই ছেড়ে দেয়। এই ভোগান্তি কমাতেই বিভাগীয় শহরে হাইকোর্টের বেঞ্চ বসানোর কথা বলা হচ্ছে। যুক্তিটা সহজ—চট্টগ্রাম, রাজশাহী বা খুলনার মতো শহরে হাইকোর্টের বেঞ্চ থাকলে মানুষ নিজের এলাকাতেই বিচার পাবে। এতে সময় ও টাকা দুটোই বাঁচবে, আবার ঢাকার ওপর থেকেও চাপ কমবে। শুনতে চমৎকার লাগলেও, এর গভীরে গেলেই কিছু অশনিসংকেত চোখে পড়ে। যে মহৎ উদ্দেশ্যের কথা বলা হচ্ছে, তা কি আদৌ পূরণ হবে, নাকি পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে? (একজন আইনজীবীর বিশ্লেষণ: আশঙ্কার কারণগুলো) আইনজীবী হিসেবে আমার দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় আমি দেখেছি, ক্ষমতা আর অর্থ কীভাবে বিচারকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করে। দেশের সর্বোচ্চ আদালত যেখানে, সেই ঢাকাতেও যদি এই চেষ্টা চলতে পারে, তাহলে ক্ষমতার কেন্দ্র যখন বিভাগীয় পর্যায়ে যাবে, তখন কী হতে পারে? আমার কথাগুলো কেবলই আশঙ্কা নয়, বরং বাস্তবতার নিরিখে কিছু যৌক্তিক বিশ্লেষণ। ১. দুর্নীতির বিস্তার ও স্থানীয় প্রভাবের ঝুঁকি আমার সবচেয়ে বড় শঙ্কাটা হলো দুর্নীতি নিয়ে। বিভাগীয় শহরে হাইকোর্টের বেঞ্চ বসালে বিচার ব্যবস্থা স্থানীয় প্রভাবশালীদের নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ার একটা বড় ঝুঁকি তৈরি হবে। এখন যেমন ঢাকার কেন্দ্রীয় কাঠামোতে স্থানীয় পর্যায়ের কোনো নেতা বা ব্যবসায়ীর পক্ষে বিচারপতিদের সরাসরি প্রভাবিত করা বেশ কঠিন, বেঞ্চ এলাকায় চলে গেলে সেই চিত্রটা পুরোপুরি পাল্টে যেতে পারে। একবার ভাবুন, কোনো বিভাগীয় শহরের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা সেই শহরের কোর্টেই উঠেছে। তিনি কি তার ক্ষমতা আর লোকবল ব্যবহার করে বিচারক বা আদালতের কর্মীদের ওপর চাপ তৈরির চেষ্টা করবেন না? বিচারকদের নিরাপত্তা তখন নির্ভর করবে স্থানীয় প্রশাসনের ওপর, যা অনেক সময়ই প্রভাবশালী মহলের কথায় চলে। এমন পরিস্থিতিতে বিচারপতিরা কি স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবেন? তখন বিচার হয়তো আইনের বদলে ক্ষমতার জোরে নির্ধারিত হবে। প্রতিটি বিভাগীয় শহরে বিচার নিয়ে এক নতুন অস্বচ্ছতার খেলা শুরু হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হবে, যেখানে সাধারণ মানুষ সুবিচারের বদলে হয়রানিই বেশি পাবে। ২. আইনি বিশৃঙ্খলা এবং নীতির অভাব বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত এবং সবার জন্য বাধ্যতামূলক। এর কারণ হলো আইনের ব্যাখ্যা ও প্রয়োগে যেন একটি সামঞ্জস্য বা একরূপতা থাকে। কিন্তু যদি দেশের বিভিন্ন বিভাগে হাইকোর্টের একাধিক বেঞ্চ স্বাধীনভাবে কাজ করতে শুরু করে, তাহলে এই একরূপতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। এমনও হতে পারে যে, একই আইনি প্রশ্নে চট্টগ্রাম বেঞ্চ এক ধরনের রায় দিচ্ছে, আর রাজশাহী বেঞ্চ দিচ্ছে তার ঠিক উল্টো রায়। এতে দেশজুড়ে চরম আইনি বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে। কোন রায়টা ঠিক, তা নিয়ে আইনজীবী থেকে শুরু করে বিচারপ্রার্থী—সবাই দিশেহারা হয়ে পড়বেন। একটি বিচার ব্যবস্থার ভিত্তিই হলো তার স্থিতিশীলতা। যদি ভিন্ন ভিন্ন বেঞ্চ থেকে পরস্পরবিরোধী রায় আসে, তবে পুরো বিচার কাঠামোর ওপর থেকেই মানুষের আস্থা উঠে যেতে পারে। ৩. অবকাঠামোগত চ্যালেঞ্জ ও বিপুল খরচ হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ স্থাপন করা কোনো ছোটখাটো বিষয় নয়। এর জন্য দরকার সুরক্ষিত আদালত ভবন, বিচারপতিদের আবাসন, আধুনিক প্রযুক্তি, বিশাল লাইব্রেরি আর কঠোর নিরাপত্তা। প্রতিটি বিভাগীয় শহরে এমন ব্যবস্থা করতে হাজার হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন। আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য এই বিশাল খরচ বহন করা কতটা বাস্তবসম্মত? শুধু তাই নয়, এর জন্য প্রয়োজন শত শত অভিজ্ঞ বিচারক ও কর্মী। আমাদের হাইকোর্টেই যেখানে বিচারকের ঘাটতি রয়েছে, সেখানে নতুন বেঞ্চগুলোর জন্য একবারে এত দক্ষ ও সৎ বিচারক কোথা থেকে আসবে? যদি তাড়াহুড়ো করে কম যোগ্যদের নিয়োগ দেওয়া হয়, তাহলে সুবিচারের মান কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? এই বাস্তবতার দিকটা ভুলে গিয়ে শুধু আবেগী সিদ্ধান্ত নিলে তা বিচার ব্যবস্থার জন্য হিতে বিপরীত হতে পারে। ৪. সাংবিধানিক প্রশ্ন এই প্রস্তাবের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি হলো, এটা কি সাংবিধানিকভাবে বৈধ? আমাদের সংবিধানের ১০০ নম্বর অনুচ্ছেদে পরিষ্কার বলা আছে যে, সুপ্রিম কোর্টের স্থায়ী আসন হবে রাজধানী ঢাকায়। যদিও প্রধান বিচারপতির সম্মতিতে রাষ্ট্রপতি অন্য কোনো জায়গায় হাইকোর্ট বিভাগের অধিবেশন বসাতে পারেন, কিন্তু "অধিবেশন" আর "স্থায়ী বেঞ্চ" এক জিনিস নয়। অনেক আইন বিশেষজ্ঞ মনে করেন, স্থায়ী বেঞ্চ স্থাপন করতে হলে তা সংবিধানের মূল কাঠামোর সাথে সাংঘর্ষিক হতে পারে, কারণ অতীতে এমন একটি উদ্যোগকে সর্বোচ্চ আদালত অবৈধ ঘোষণা করেছিল। (পাল্টা যুক্তির উত্তর) যারা এই প্রস্তাবের পক্ষে, তাদের সবচেয়ে বড় যুক্তি হলো মানুষের ভোগান্তি কমানো। কথাটা মানবিক এবং আকর্ষণীয়, কিন্তু এর অন্য পিঠও রয়েছে। মানুষের কষ্ট হয়, এটা । কিন্তু সেই কষ্ট কমাতে গিয়ে যদি আমরা বিচার ব্যবস্থাকেই দুর্বল করে ফেলি, তাহলে সেই সমাধানের কী অর্থ থাকে? একজন বিচারপ্রার্থী যদি তার বাড়ির কাছে আদালত পেয়েও দেখেন যে সেখানে প্রভাবশালীরা রায় নিয়ন্ত্রণ করছে, তাহলে সেই আদালতের থাকা বা না থাকায় তার কী লাভ? তখন তার শুধু অর্থই যাবে না, ন্যায়বিচার পাওয়ার শেষ ভরসাটুকুও হারিয়ে যাবে। প্রকৃত সমাধান হলো বর্তমান বিচার ব্যবস্থাকে ভেতর থেকে শক্তিশালী করা। বিচারকের সংখ্যা বাড়ানো, প্রযুক্তি ব্যবহার করে মামলা ব্যবস্থাপনাকে আধুনিক করা এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়াই মামলার জট কমানোর আসল পথ। মানুষের ভোগান্তি কমানোর নামে বিচার ব্যবস্থাকে ঝুঁকির মুখে ফেলাটা অনেকটা মাথাব্যথার জন্য মাথা কেটে ফেলার মতোই বিপজ্জনক। (উপসংহার) হাইকোর্টের বেঞ্চ বিভাগীয় শহরে স্থাপনের সিদ্ধান্তটি অত্যন্ত সংবেদনশীল। এর সাথে দেশের বিচার ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ জড়িত। কোনো হঠকারী সিদ্ধান্তের আগে এর সব দিক ভালোভাবে ভেবে দেখা জরুরি। দিনশেষে প্রশ্ন একটাই: এই পদক্ষেপের মাধ্যমে আমরা কি সুবিচারের বিকেন্দ্রীকরণ করতে যাচ্ছি, নাকি দুর্নীতির? এই প্রশ্নটি আজ আমাদের সকলের বিবেকের কাছে। (আপনার মতামত কী?) হাইকোর্টের বেঞ্চ বিভাগীয় শহরে স্থাপন করা নিয়ে আপনার কী মত? আপনি কি মনে করেন এটি সুবিচারকে সহজ করবে, নাকি একে আরও জটিল করে তুলবে? আপনার মূল্যবান মতামত নিচের কমেন্ট বক্সে জানান। এই গুরুত্বপূর্ণ আলোচনাটি সবার কাছে পৌঁছে দিতে পোস্টটি শেয়ার করুন। কারণ একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ বিচার ব্যবস্থা আমাদের সবার অধিকার। এডভোকেট সফিকুল ইসলাম সবুজ খাঁন চেয়ারম্যান, জনতার বাংলাদেশ পার্টি?

আপনার মতামত লিখুন

পরবর্তী খবর
ডি এস কে টিভি চ্যানেল

বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬


হাইকোর্টের বেঞ্চগুলো বিভাগীয় পর্যায়ে যায় মারাত্মক আকারে দূর্ণীতি হবে।

প্রকাশের তারিখ : ১০ জুলাই ২০২৫

featured Image
হাইকোর্টের বেঞ্চ ঢাকার বাইরে বিভাগীয় শহরে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তাবটা বেশ কিছুদিন ধরেই আলোচনায় আছে। এর পক্ষে যারা বলছেন, তাদের যুক্তি হলো—এতে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় বিচার পৌঁছে যাবে, কষ্ট কমবে। কিন্তু ছবিটা কি আসলেই এতটা সহজ? একজন আইনজীবী হিসেবে আমি এই প্রস্তাবের পেছনে কিছু গুরুতর ঝুঁকির আভাস পাচ্ছি। আমার নাম সবুজ খাঁন, এবং আজ আমি আপনাদের সামনে তুলে ধরব, কেন এই আপাতদৃষ্টিতে ভালো উদ্যোগটি আসলে দুর্নীতির এক নতুন দুয়ার খুলে দিতে পারে। এটা তো আমরা সবাই জানি যে আমাদের বিচার ব্যবস্থায় মামলার জট একটা বিরাট সমস্যা। লক্ষ লক্ষ মামলা ঝুলে আছে, আর একটা রায়ের জন্য মানুষকে বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হয়। এর একটা বড় কারণ হিসেবে দেখানো হয়, আমাদের বিচার ব্যবস্থা পুরোপুরি ঢাকাকেন্দ্রিক। দেশের একমাত্র সুপ্রিম কোর্ট আর তার হাইকোর্ট বিভাগ রাজধানীতে হওয়ায় পঞ্চগড় বা বান্দরবানের মতো দূরবর্তী এলাকার একজন মানুষকেও সামান্য আইনি প্রতিকারের জন্য শত শত কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে ঢাকায় আসতে হয়। এই যাতায়াত, থাকা-খাওয়া আর আইনজীবীর খরচ যোগানো অনেকের জন্যই প্রায় অসম্ভব। ফলে বহু মানুষ বাধ্য হয়ে ন্যায়বিচার চাওয়ার আশাই ছেড়ে দেয়। এই ভোগান্তি কমাতেই বিভাগীয় শহরে হাইকোর্টের বেঞ্চ বসানোর কথা বলা হচ্ছে। যুক্তিটা সহজ—চট্টগ্রাম, রাজশাহী বা খুলনার মতো শহরে হাইকোর্টের বেঞ্চ থাকলে মানুষ নিজের এলাকাতেই বিচার পাবে। এতে সময় ও টাকা দুটোই বাঁচবে, আবার ঢাকার ওপর থেকেও চাপ কমবে। শুনতে চমৎকার লাগলেও, এর গভীরে গেলেই কিছু অশনিসংকেত চোখে পড়ে। যে মহৎ উদ্দেশ্যের কথা বলা হচ্ছে, তা কি আদৌ পূরণ হবে, নাকি পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে? (একজন আইনজীবীর বিশ্লেষণ: আশঙ্কার কারণগুলো) আইনজীবী হিসেবে আমার দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় আমি দেখেছি, ক্ষমতা আর অর্থ কীভাবে বিচারকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করে। দেশের সর্বোচ্চ আদালত যেখানে, সেই ঢাকাতেও যদি এই চেষ্টা চলতে পারে, তাহলে ক্ষমতার কেন্দ্র যখন বিভাগীয় পর্যায়ে যাবে, তখন কী হতে পারে? আমার কথাগুলো কেবলই আশঙ্কা নয়, বরং বাস্তবতার নিরিখে কিছু যৌক্তিক বিশ্লেষণ। ১. দুর্নীতির বিস্তার ও স্থানীয় প্রভাবের ঝুঁকি আমার সবচেয়ে বড় শঙ্কাটা হলো দুর্নীতি নিয়ে। বিভাগীয় শহরে হাইকোর্টের বেঞ্চ বসালে বিচার ব্যবস্থা স্থানীয় প্রভাবশালীদের নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ার একটা বড় ঝুঁকি তৈরি হবে। এখন যেমন ঢাকার কেন্দ্রীয় কাঠামোতে স্থানীয় পর্যায়ের কোনো নেতা বা ব্যবসায়ীর পক্ষে বিচারপতিদের সরাসরি প্রভাবিত করা বেশ কঠিন, বেঞ্চ এলাকায় চলে গেলে সেই চিত্রটা পুরোপুরি পাল্টে যেতে পারে। একবার ভাবুন, কোনো বিভাগীয় শহরের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা সেই শহরের কোর্টেই উঠেছে। তিনি কি তার ক্ষমতা আর লোকবল ব্যবহার করে বিচারক বা আদালতের কর্মীদের ওপর চাপ তৈরির চেষ্টা করবেন না? বিচারকদের নিরাপত্তা তখন নির্ভর করবে স্থানীয় প্রশাসনের ওপর, যা অনেক সময়ই প্রভাবশালী মহলের কথায় চলে। এমন পরিস্থিতিতে বিচারপতিরা কি স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবেন? তখন বিচার হয়তো আইনের বদলে ক্ষমতার জোরে নির্ধারিত হবে। প্রতিটি বিভাগীয় শহরে বিচার নিয়ে এক নতুন অস্বচ্ছতার খেলা শুরু হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হবে, যেখানে সাধারণ মানুষ সুবিচারের বদলে হয়রানিই বেশি পাবে। ২. আইনি বিশৃঙ্খলা এবং নীতির অভাব বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত এবং সবার জন্য বাধ্যতামূলক। এর কারণ হলো আইনের ব্যাখ্যা ও প্রয়োগে যেন একটি সামঞ্জস্য বা একরূপতা থাকে। কিন্তু যদি দেশের বিভিন্ন বিভাগে হাইকোর্টের একাধিক বেঞ্চ স্বাধীনভাবে কাজ করতে শুরু করে, তাহলে এই একরূপতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। এমনও হতে পারে যে, একই আইনি প্রশ্নে চট্টগ্রাম বেঞ্চ এক ধরনের রায় দিচ্ছে, আর রাজশাহী বেঞ্চ দিচ্ছে তার ঠিক উল্টো রায়। এতে দেশজুড়ে চরম আইনি বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে। কোন রায়টা ঠিক, তা নিয়ে আইনজীবী থেকে শুরু করে বিচারপ্রার্থী—সবাই দিশেহারা হয়ে পড়বেন। একটি বিচার ব্যবস্থার ভিত্তিই হলো তার স্থিতিশীলতা। যদি ভিন্ন ভিন্ন বেঞ্চ থেকে পরস্পরবিরোধী রায় আসে, তবে পুরো বিচার কাঠামোর ওপর থেকেই মানুষের আস্থা উঠে যেতে পারে। ৩. অবকাঠামোগত চ্যালেঞ্জ ও বিপুল খরচ হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ স্থাপন করা কোনো ছোটখাটো বিষয় নয়। এর জন্য দরকার সুরক্ষিত আদালত ভবন, বিচারপতিদের আবাসন, আধুনিক প্রযুক্তি, বিশাল লাইব্রেরি আর কঠোর নিরাপত্তা। প্রতিটি বিভাগীয় শহরে এমন ব্যবস্থা করতে হাজার হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন। আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য এই বিশাল খরচ বহন করা কতটা বাস্তবসম্মত? শুধু তাই নয়, এর জন্য প্রয়োজন শত শত অভিজ্ঞ বিচারক ও কর্মী। আমাদের হাইকোর্টেই যেখানে বিচারকের ঘাটতি রয়েছে, সেখানে নতুন বেঞ্চগুলোর জন্য একবারে এত দক্ষ ও সৎ বিচারক কোথা থেকে আসবে? যদি তাড়াহুড়ো করে কম যোগ্যদের নিয়োগ দেওয়া হয়, তাহলে সুবিচারের মান কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? এই বাস্তবতার দিকটা ভুলে গিয়ে শুধু আবেগী সিদ্ধান্ত নিলে তা বিচার ব্যবস্থার জন্য হিতে বিপরীত হতে পারে। ৪. সাংবিধানিক প্রশ্ন এই প্রস্তাবের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি হলো, এটা কি সাংবিধানিকভাবে বৈধ? আমাদের সংবিধানের ১০০ নম্বর অনুচ্ছেদে পরিষ্কার বলা আছে যে, সুপ্রিম কোর্টের স্থায়ী আসন হবে রাজধানী ঢাকায়। যদিও প্রধান বিচারপতির সম্মতিতে রাষ্ট্রপতি অন্য কোনো জায়গায় হাইকোর্ট বিভাগের অধিবেশন বসাতে পারেন, কিন্তু "অধিবেশন" আর "স্থায়ী বেঞ্চ" এক জিনিস নয়। অনেক আইন বিশেষজ্ঞ মনে করেন, স্থায়ী বেঞ্চ স্থাপন করতে হলে তা সংবিধানের মূল কাঠামোর সাথে সাংঘর্ষিক হতে পারে, কারণ অতীতে এমন একটি উদ্যোগকে সর্বোচ্চ আদালত অবৈধ ঘোষণা করেছিল। (পাল্টা যুক্তির উত্তর) যারা এই প্রস্তাবের পক্ষে, তাদের সবচেয়ে বড় যুক্তি হলো মানুষের ভোগান্তি কমানো। কথাটা মানবিক এবং আকর্ষণীয়, কিন্তু এর অন্য পিঠও রয়েছে। মানুষের কষ্ট হয়, এটা । কিন্তু সেই কষ্ট কমাতে গিয়ে যদি আমরা বিচার ব্যবস্থাকেই দুর্বল করে ফেলি, তাহলে সেই সমাধানের কী অর্থ থাকে? একজন বিচারপ্রার্থী যদি তার বাড়ির কাছে আদালত পেয়েও দেখেন যে সেখানে প্রভাবশালীরা রায় নিয়ন্ত্রণ করছে, তাহলে সেই আদালতের থাকা বা না থাকায় তার কী লাভ? তখন তার শুধু অর্থই যাবে না, ন্যায়বিচার পাওয়ার শেষ ভরসাটুকুও হারিয়ে যাবে। প্রকৃত সমাধান হলো বর্তমান বিচার ব্যবস্থাকে ভেতর থেকে শক্তিশালী করা। বিচারকের সংখ্যা বাড়ানো, প্রযুক্তি ব্যবহার করে মামলা ব্যবস্থাপনাকে আধুনিক করা এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়াই মামলার জট কমানোর আসল পথ। মানুষের ভোগান্তি কমানোর নামে বিচার ব্যবস্থাকে ঝুঁকির মুখে ফেলাটা অনেকটা মাথাব্যথার জন্য মাথা কেটে ফেলার মতোই বিপজ্জনক। (উপসংহার) হাইকোর্টের বেঞ্চ বিভাগীয় শহরে স্থাপনের সিদ্ধান্তটি অত্যন্ত সংবেদনশীল। এর সাথে দেশের বিচার ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ জড়িত। কোনো হঠকারী সিদ্ধান্তের আগে এর সব দিক ভালোভাবে ভেবে দেখা জরুরি। দিনশেষে প্রশ্ন একটাই: এই পদক্ষেপের মাধ্যমে আমরা কি সুবিচারের বিকেন্দ্রীকরণ করতে যাচ্ছি, নাকি দুর্নীতির? এই প্রশ্নটি আজ আমাদের সকলের বিবেকের কাছে। (আপনার মতামত কী?) হাইকোর্টের বেঞ্চ বিভাগীয় শহরে স্থাপন করা নিয়ে আপনার কী মত? আপনি কি মনে করেন এটি সুবিচারকে সহজ করবে, নাকি একে আরও জটিল করে তুলবে? আপনার মূল্যবান মতামত নিচের কমেন্ট বক্সে জানান। এই গুরুত্বপূর্ণ আলোচনাটি সবার কাছে পৌঁছে দিতে পোস্টটি শেয়ার করুন। কারণ একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ বিচার ব্যবস্থা আমাদের সবার অধিকার। এডভোকেট সফিকুল ইসলাম সবুজ খাঁন চেয়ারম্যান, জনতার বাংলাদেশ পার্টি?

ডি এস কে টিভি চ্যানেল

চেয়ারম্যান ও সম্পাদকঃ সামসুল আলম
বার্তা সম্পাদকঃ মোঃ আসআদ

কপিরাইট © ২০২৫ ডি এস কে টিভি চ্যানেল