মরদেহ গুম করতে মাথা বিচ্ছিন্ন ও টুকরো করার চেষ্টা; জানালার গ্রিল কেটে পালিয়েও শেষ রক্ষা হলো না ঘাতক সোহেল রানার
নিজস্ব প্রতিবেদক, বিশেষ প্রতিবেদন হাসান মাহমুদ জয়
রাজধানী ঢাকার মিরপুরের পল্লবীতে দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ুয়া সাত বছর বয়সী শিশু রামিসা আক্তারকে নৃশংসভাবে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। অপরাধ গোপন ও মরদেহ গুম করার উদ্দেশ্যে শিশুটির ঘাড় থেকে মাথা বিচ্ছিন্ন করে ফেলে ঘাতক। শুধু তাই নয়, শরীরের অন্য অংশগুলোও টুকরো করার চেষ্টা চালানো হয়।
লোমহর্ষক এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় প্রধান অভিযুক্ত পাশের ফ্ল্যাটের ভাড়াটিয়া সোহেল রানা (৩০) ও তার সহযোগী স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে (২৬) গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ঘটনার পর মূল আসামি সোহেল রানা জানালার গ্রিল কেটে পালিয়ে গেলেও গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মিরপুর-১১ নম্বর সেকশনের বি-ব্লকের একটি বহুতল ভবনের তিনতলার উত্তর পাশের ফ্ল্যাটে দীর্ঘদিন ধরে সপরিবারে বসবাস করে আসছিল রামিসার পরিবার। মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে প্রতিদিনের মতো রামিসাকে স্কুলে পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন তার মা। কিন্তু হঠাৎ করেই শিশুটিকে বাসার কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। একপর্যায়ে তিনতলারই পাশের ফ্ল্যাটের দরজার সামনে রামিসার এক পাটি স্যান্ডেল পড়ে থাকতে দেখে মায়ের মনে সন্দেহ জাগে।
তখনই প্রতিবেশীদের সাথে নিয়ে ওই ফ্ল্যাটের দরজায় অনেক ডাকাডাকি করা হলেও ভেতর থেকে কোনো সাড়া মিলছিল না। একপর্যায়ে মায়ের আর্তচিৎকারে স্থানীয়রা জড়ো হয়ে দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করতেই বেরিয়ে আসে এক বীভৎস দৃশ্য। ঘরের খাটের নিচে পড়ে ছিল শিশু রামিসার নিথর দেহ, তবে শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল তার মাথাটি। পরবর্তীতে শৌচাগারের বালতি থেকে রামিসার খণ্ডিত মাথা উদ্ধার করা হয়।
ততক্ষণে মূল আসামি সোহেল রানা ঘরের জানালার গ্রিল কেটে পালিয়ে গেলেও ভেতরে থাকা তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে ধরে ফেলে জনতা। খবর পেয়ে পল্লবী থানা-পুলিশ, সিআইডি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে তদন্ত শুরু করেন।
এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) এস এন নজরুল ইসলাম সংবাদ সম্মেলনে জানান, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে—পাশের ফ্ল্যাটের বাথরুমে শিশুটিকে ধর্ষণের পর অতিরিক্ত রক্তপাত শুরু হলে তাকে হত্যা করা হয়। পরে মরদেহ সম্পূর্ণ খণ্ডবিখণ্ড করে গুম করার পরিকল্পনা ছিল আসামির। কিন্তু রামিসার মা দরজায় ধাক্কাধাক্কি শুরু করায় পুরো পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে না পেরে আসামি গ্রিল কেটে পালিয়ে যায়।
পুলিশ আরও জানায়, গ্রেপ্তার সোহেল রানা পেশায় একজন রিকশা মেকানিক এবং সে বিকৃত যৌনরুচিসম্পন্ন ও মাদকাসক্ত। তার বিরুদ্ধে নাটোরে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে আগের একটি মামলা রয়েছে। এই হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত ছুরি এবং বিচ্ছিন্ন মাথাসহ গুরুত্বপূর্ণ আলামত ইতোমধ্যে উদ্ধার করা হয়েছে। লাশ ময়নাতদন্তের জন্য শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ মর্গে পাঠানো হয়েছে।
এদিকে এই নৃশংস ও বর্বর হত্যাকাণ্ডের খবর ছড়িয়ে পড়লে পুরো মিরপুর এলাকায় তীব্র ক্ষোভ ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বইছে নিন্দার ঝড়। একটি নিষ্পাপ শিশুর সাথে এমন পাশবিক নিষ্ঠুরতার ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে এনে দৃষ্টান্তমূলক ফাঁসির দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও সাধারণ নাগরিকরা।
আইনজীবীদের একাংশ এবং মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, দেশে প্রায়শই এমন জঘন্য ঘটনা ঘটছে এবং অপরাধীদের মনে কোনো ভয় কাজ করছে না। বিচার ব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতা ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির অভাবই অপরাধীদের এমন দুঃসাহস বাড়িয়ে দিচ্ছে। শিশু রামিসা হত্যার দ্রুত ও সুষ্ঠু বিচারের মাধ্যমে এই বিচারহীনতার সংস্কৃতির অবসান ঘটানোর দাবি এখন সবার।

বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২০ মে ২০২৬
মরদেহ গুম করতে মাথা বিচ্ছিন্ন ও টুকরো করার চেষ্টা; জানালার গ্রিল কেটে পালিয়েও শেষ রক্ষা হলো না ঘাতক সোহেল রানার
নিজস্ব প্রতিবেদক, বিশেষ প্রতিবেদন হাসান মাহমুদ জয়
রাজধানী ঢাকার মিরপুরের পল্লবীতে দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ুয়া সাত বছর বয়সী শিশু রামিসা আক্তারকে নৃশংসভাবে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। অপরাধ গোপন ও মরদেহ গুম করার উদ্দেশ্যে শিশুটির ঘাড় থেকে মাথা বিচ্ছিন্ন করে ফেলে ঘাতক। শুধু তাই নয়, শরীরের অন্য অংশগুলোও টুকরো করার চেষ্টা চালানো হয়।
লোমহর্ষক এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় প্রধান অভিযুক্ত পাশের ফ্ল্যাটের ভাড়াটিয়া সোহেল রানা (৩০) ও তার সহযোগী স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে (২৬) গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ঘটনার পর মূল আসামি সোহেল রানা জানালার গ্রিল কেটে পালিয়ে গেলেও গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মিরপুর-১১ নম্বর সেকশনের বি-ব্লকের একটি বহুতল ভবনের তিনতলার উত্তর পাশের ফ্ল্যাটে দীর্ঘদিন ধরে সপরিবারে বসবাস করে আসছিল রামিসার পরিবার। মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে প্রতিদিনের মতো রামিসাকে স্কুলে পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন তার মা। কিন্তু হঠাৎ করেই শিশুটিকে বাসার কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। একপর্যায়ে তিনতলারই পাশের ফ্ল্যাটের দরজার সামনে রামিসার এক পাটি স্যান্ডেল পড়ে থাকতে দেখে মায়ের মনে সন্দেহ জাগে।
তখনই প্রতিবেশীদের সাথে নিয়ে ওই ফ্ল্যাটের দরজায় অনেক ডাকাডাকি করা হলেও ভেতর থেকে কোনো সাড়া মিলছিল না। একপর্যায়ে মায়ের আর্তচিৎকারে স্থানীয়রা জড়ো হয়ে দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করতেই বেরিয়ে আসে এক বীভৎস দৃশ্য। ঘরের খাটের নিচে পড়ে ছিল শিশু রামিসার নিথর দেহ, তবে শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল তার মাথাটি। পরবর্তীতে শৌচাগারের বালতি থেকে রামিসার খণ্ডিত মাথা উদ্ধার করা হয়।
ততক্ষণে মূল আসামি সোহেল রানা ঘরের জানালার গ্রিল কেটে পালিয়ে গেলেও ভেতরে থাকা তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে ধরে ফেলে জনতা। খবর পেয়ে পল্লবী থানা-পুলিশ, সিআইডি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে তদন্ত শুরু করেন।
এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) এস এন নজরুল ইসলাম সংবাদ সম্মেলনে জানান, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে—পাশের ফ্ল্যাটের বাথরুমে শিশুটিকে ধর্ষণের পর অতিরিক্ত রক্তপাত শুরু হলে তাকে হত্যা করা হয়। পরে মরদেহ সম্পূর্ণ খণ্ডবিখণ্ড করে গুম করার পরিকল্পনা ছিল আসামির। কিন্তু রামিসার মা দরজায় ধাক্কাধাক্কি শুরু করায় পুরো পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে না পেরে আসামি গ্রিল কেটে পালিয়ে যায়।
পুলিশ আরও জানায়, গ্রেপ্তার সোহেল রানা পেশায় একজন রিকশা মেকানিক এবং সে বিকৃত যৌনরুচিসম্পন্ন ও মাদকাসক্ত। তার বিরুদ্ধে নাটোরে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে আগের একটি মামলা রয়েছে। এই হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত ছুরি এবং বিচ্ছিন্ন মাথাসহ গুরুত্বপূর্ণ আলামত ইতোমধ্যে উদ্ধার করা হয়েছে। লাশ ময়নাতদন্তের জন্য শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ মর্গে পাঠানো হয়েছে।
এদিকে এই নৃশংস ও বর্বর হত্যাকাণ্ডের খবর ছড়িয়ে পড়লে পুরো মিরপুর এলাকায় তীব্র ক্ষোভ ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বইছে নিন্দার ঝড়। একটি নিষ্পাপ শিশুর সাথে এমন পাশবিক নিষ্ঠুরতার ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে এনে দৃষ্টান্তমূলক ফাঁসির দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও সাধারণ নাগরিকরা।
আইনজীবীদের একাংশ এবং মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, দেশে প্রায়শই এমন জঘন্য ঘটনা ঘটছে এবং অপরাধীদের মনে কোনো ভয় কাজ করছে না। বিচার ব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতা ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির অভাবই অপরাধীদের এমন দুঃসাহস বাড়িয়ে দিচ্ছে। শিশু রামিসা হত্যার দ্রুত ও সুষ্ঠু বিচারের মাধ্যমে এই বিচারহীনতার সংস্কৃতির অবসান ঘটানোর দাবি এখন সবার।

আপনার মতামত লিখুন