ডি এস কে টিভি চ্যানেল
প্রকাশ : শুক্রবার, ০১ আগস্ট ২০২৫

খাবারের জন্য খালি পায়ে ১২ কিমি হেঁটে আসা ছোট্ট আমিরকেও ছাড়েনি ইসরাইল

খাবারের জন্য খালি পায়ে ১২ কিমি হেঁটে আসা ছোট্ট আমিরকেও ছাড়েনি ইসরাইল
খাবারের জন্য খালি পায়ে ১২ কিমি হেঁটে আসা ছোট্ট আমিরকেও ছাড়েনি ইসরাইল** এক মুঠো খাবারের দাম কি মৃত্যু হতে পারে? গাজার ক্ষুধার্ত শিশুদের জন্য এই প্রশ্নটা কোনো গল্প নয়, এটাই ওখানকার কঠিন আর নির্মম বাস্তবতা। আজ আমরা আমিরের গল্প শুনব। যে শিশুটা শুধু একটু খাবারের জন্য ১২ কিলোমিটার পথ খালি পায়ে হেঁটে এসেছিল। তার স্বপ্ন ছিল সামান্য খাবার, কিন্তু তার প্লেটে সেই খাবার ওঠার আগেই ইসরায়েলি বাহিনীর বুলেট তার সব স্বপ্ন কেড়ে নেয়। আমিরের এই গল্প কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটা গাজার হাজারো শিশুর প্রতিদিনের লড়াই আর মর্মান্তিক পরিণতির এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।  (আমিরের মরিয়া যাত্রা) একবার ভাবুন তো সেই শিশুটির কথা, যার পৃথিবীটা আটকে গেছে ধ্বংসস্তূপ আর বারুদের গন্ধে। তার নাম আমির। গাজার অন্য শিশুদের মতোই তার চোখেও স্বপ্ন ছিল, কিন্তু পেটে ছিল তীব্র ক্ষুধা। যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজায় যখন খাবারের অভাব চরমে, তখন একমুঠো খাবারের জন্য তার ছোট্ট দুটি পা এক অসাধ্য সাধনে নামে। অপুষ্টিতে ভোগা শীর্ণ শরীরটাকে টেনে নিয়ে সে হাঁটা শুরু করে। মাথার ওপর গনগনে সূর্য আর পায়ের নিচে ভাঙাচোরা উত্তপ্ত রাস্তা। ১২ কিলোমিটার পথ—যেটা একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের জন্যও কঠিন, সেই পথ সে পাড়ি দিয়েছিল খালি পায়ে। তার এই যাত্রা শুধু খাবারের জন্য ছিল না, ছিল বেঁচে থাকার এক মরিয়া চেষ্টা। জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা বারবার সতর্ক করে বলেছে, গাজা এক ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে। জাতিসংঘ-সমর্থিত ইন্টিগ্রেটেড ফুড সিকিউরিটি ফেইজ ক্লাসিফিকেশন (আইপিসি) তাদের সাম্প্রতিক রিপোর্টে জানিয়েছে যে গাজার বেশিরভাগ এলাকা দুর্ভিক্ষের সীমায় পৌঁছে গেছে এবং ব্যাপক অনাহার আর অপুষ্টিতে মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। এই ভয়াবহ সংকটের মধ্যেই আমিরের মতো শিশুরা প্রতিদিন নিজেদের জীবন বাজি রেখে খাবারের খোঁজে বের হয়। তাদের কাছে ক্ষুধা যেন মৃত্যুর চেয়েও বড় ভয়। আমিরের খালি পায়ের প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল সেই ভয়ংকর বাস্তবতার একেকটি চিহ্ন, যা পুরো বিশ্বের কাছে একটাই প্রশ্ন ছুঁড়ে দিচ্ছিল—এই শিশুদের অপরাধটা  (এক চিলতে আশা) দীর্ঘ আর ক্লান্তিকর পথ পাড়ি দিয়ে আমির শেষ পর্যন্ত একটা ত্রাণ বিতরণ কেন্দ্রের কাছে পৌঁছায়। সেখানে তখন শত শত ক্ষুধার্ত মানুষের ভিড়। বিশৃঙ্খলা আর হাহাকারের মধ্যেই প্রত্যেকে চেষ্টা করছে সামান্য কিছু খাবার জোগাড় করার। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে থাকার পর, তার অপেক্ষার পালা শেষ হয়। তার ছোট্ট দুই হাতে তুলে দেওয়া হয় সামান্য কিছু চাল আর ডাল। সেই মুহূর্তে আমিরের শীর্ণ মুখে যে হাসি ফুটে উঠেছিল, তা ছিল অমূল্য। শত কষ্ট ভুলে সে কৃতজ্ঞতার চোখে পাশে থাকা একজন ত্রাণকর্মীর দিকে তাকিয়েছিল। তার চোখে তখন নতুন স্বপ্ন—এই খাবারটুকু নিয়ে সে বাড়ি ফিরবে, হয়তো অনেক দিন পর তার পরিবারের মুখেও হাসি ফুটবে। সেই মুহূর্তটা ছিল এক ঝলক আলোর মতো। ধ্বংস আর মৃত্যুর উপত্যকায় এক চিলতে আশা। যে শিশুটা ১২ কিলোমিটার পথ খালি পায়ে হেঁটে এসেছে, তার কাছে এই সামান্য খাবারটুকুই ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে বড় পুরস্কার। সে হয়তো ভেবেছিল, তার কষ্ট সার্থক হয়েছে। কিন্তু সে জানত না, গাজার আকাশে আশা আর স্বপ্ন—দুটোই খুব ক্ষণস্থায়ী। সে জানত না, তার এই আনন্দটুকু কেড়ে নেওয়ার জন্য মৃত্যু ঠিক তার পেছনেই অপেক্ষা করছে।  (শিখা নিভে গেল) খাবার হাতে পেয়ে ভিড়ের মধ্য দিয়ে বাড়ির পথ ধরেছিল আমির। কিন্তু কয়েক পা এগোতেই তার চারপাশের পৃথিবীটা যেন কেঁপে উঠল। হঠাৎ শুরু হলো প্রচণ্ড গোলাগুলি। মুহূর্তে আনন্দ আর কোলাহলের জায়গা দখল করে নিল আতঙ্ক আর আর্তনাদ। ক্ষুধার্ত মানুষগুলো জীবন বাঁচাতে দিগ্বিদিক ছুটতে শুরু করে। এটা গাজায় কোনো নতুন দৃশ্য নয়। ত্রাণপ্রার্থীদের ওপর হামলা যেন এক নিয়মিত ও নির্মম বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। এর আগেও বহুবার বিভিন্ন ত্রাণকেন্দ্রের কাছে খাবার সংগ্রহ করতে আসা ক্ষুধার্ত মানুষের ওপর ইসরায়েলি বাহিনীর হামলার ঘটনা ঘটেছে। জাতিসংঘের তথ্যমতে, মে মাসের শেষের দিক থেকে এ পর্যন্ত ত্রাণ সংগ্রহ করতে গিয়েই ১,৩০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। সেই দিনের বিশৃঙ্খলার মধ্যে একটি বুলেট এসে আমিরের ছোট্ট শরীরটাকে এফোঁড়-ওফোঁড় করে দেয়। তার হাত থেকে খাবারের ব্যাগটা ছিটকে পড়ে যায়। যে চাল আর ডালের জন্য সে এত দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়েছিল, তা মিশে যায় রাস্তার ধুলো আর তার রক্তের সঙ্গে। এক মুহূর্তের জন্য যে চোখে স্বপ্ন ছিল, সেই চোখ নিথর হয়ে যায়। আমিরের ১২ কিলোমিটারের যাত্রা শেষ হয়, কিন্তু তার আর ঘরে ফেরা হয় না।  (বৃহত্তর ট্র্যাজেডি: আমিরই প্রতিটি শিশু) আমিরের মৃত্যু কোনো একক ঘটনা নয়, এটি গাজার চলমান মানবিক বিপর্যয়ের একটি অংশ মাত্র, যাকে অনেক মানবাধিকার সংস্থা ও বিশেষজ্ঞ গণহত্যা বলে আখ্যায়িত করেছেন। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুসারে, চলমান সংঘাতে নিহতের সংখ্যা ৬০,০০০ ছাড়িয়েছে। ওয়াশিংটন পোস্টের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিহতদের মধ্যে শিশুর সংখ্যা ১৮,৫০০-এর বেশি, যাদের অনেকের নাম ও বয়স তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। এর মানে হলো, এই যুদ্ধে প্রতি ঘণ্টায় একাধিক শিশুর প্রাণ কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। এই সংকট শুধু বোমার আঘাতেই সীমাবদ্ধ নেই। এটি এমন এক পরিস্থিতি তৈরি করেছে যাকে জাতিসংঘ এবং অন্যান্য সংস্থাগুলো "মানবসৃষ্ট" বিপর্যয় বলছে। জাতিসংঘের খাদ্য নিরাপত্তা সংস্থা আইপিসি সতর্ক করে বলেছে যে গাজায় দুর্ভিক্ষের সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি এখন চোখের সামনেই ঘটছে। অপুষ্টির হার ভয়াবহভাবে বাড়ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) জানিয়েছে, শুধুমাত্র জুলাই ২০২৫-এই অপুষ্টিজনিত কারণে ৬৩ জনের মৃত্যু হয়েছে, যাদের একটা বড় অংশই শিশু। মায়েরা নিজেরাও অপুষ্টিতে ভোগার কারণে শিশুদের বুকের দুধ খাওয়াতে পারছেন না। ফলে শিশুরা কঙ্কালে পরিণত হচ্ছে। ত্রাণ বিতরণ ব্যবস্থাও প্রায় ভেঙে পড়েছে। যে সামান্য ত্রাণ গাজায় ঢুকছে, তা প্রয়োজনের তুলনায় একেবারেই নগণ্য। আর সেই ত্রাণ সংগ্রহ করতে গিয়েও সাধারণ মানুষকে জীবনের ঝুঁকি নিতে হচ্ছে।  (বিশ্বের নীরবতা) আমিরের মতো হাজারো শিশুর আর্তনাদ কি বিশ্বের ক্ষমতাধর নেতাদের কানে পৌঁছাচ্ছে না? যখন একটা শিশুকে একমুঠো খাবারের জন্য প্রাণ দিতে হয়, তখন আন্তর্জাতিক আইন আর মানবাধিকারের কথাগুলো ফাঁপা শোনায়। গাজার শিশুরা যখন ক্ষুধায় কাতরাচ্ছে, তখনও নিরাপত্তা পরিষদে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবে ভেটো দেওয়া হয়, যা এই সংকটকে আরও দীর্ঘায়িত করে। আমরা এমন এক পৃথিবীতে বাস করছি, যেখানে শিশুদের বেঁচে থাকার অধিকারের চেয়ে ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। গাজার প্রতিটি শিশুর মৃত্যু মানবতা এবং বিশ্ববিবেকের মুখে এক একটি চপেটাঘাত। বছরের পর বছর ধরে চলা এই নৃশংসতা দেখেও বিশ্ব সম্প্রদায়ের নীরবতা এক ঐতিহাসিক ব্যর্থতা হিসেবেই চিহ্নিত হয়ে থাকবে। আমরা কি এমন একটি প্রজন্ম হতে চাই, যারা হাজার হাজার শিশুর মৃত্যু অসহায়ভাবে শুধু দেখেই গেছে? এই প্রশ্নটা আজ আমাদের সবার| আমিরের গল্পটা এখানেই শেষ, কিন্তু গাজার হাজারো শিশুর বেঁচে থাকার লড়াই এখনো থামেনি। এই অমানবিকতা নিয়ে সচেতনতা তৈরি করা আমাদের সবার নৈতিক দায়িত্ব। যদি আমিরের এই গল্প আপনার মনে এতটুকুও নাড়া দিয়ে থাকে, তাহলে আর চুপ থাকবেন না। আপনার বন্ধু এবং পরিবারের সঙ্গে শেয়ার করে এই বার্তাটি সবার কাছে পৌঁছে দিন। এই নৃশংসতার বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলুন। কমেন্টে আপনার মতামত জানান। আপনার প্রতিটি শেয়ার হয়তো কারো বিবেককে জাগিয়ে তুলতে সাহায্য করবে। আমির খালি পায়ে হেঁটেছিল খাবারের জন্য, কিন্তু সে ফিরে গেল একরাশ শূন্যতা নিয়ে, চিরতরে। তার ব্যাগ থেকে ঝরে পড়া চাল আর ডালের মতোই গাজার মাটিতে মিশে যাচ্ছে হাজারো শিশুর অপূর্ণ স্বপ্ন। এই বর্বরতার শেষ কোথায়? এই প্রশ্নের উত্তর হয়তো আমাদের সবারই জানা, কিন্তু আমরা তা স্বীকার করতে ভয় পাই। যতক্ষণ না বিশ্ব এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে একসুরে কথা বলছে, ততক্ষণ আমিরের মতো আরও অনেক শিশুকে খাবারের খোঁজে বেরিয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তে হবে।

আপনার মতামত লিখুন

পরবর্তী খবর
ডি এস কে টিভি চ্যানেল

বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট ২০২৬


খাবারের জন্য খালি পায়ে ১২ কিমি হেঁটে আসা ছোট্ট আমিরকেও ছাড়েনি ইসরাইল

প্রকাশের তারিখ : ০১ আগস্ট ২০২৫

featured Image
খাবারের জন্য খালি পায়ে ১২ কিমি হেঁটে আসা ছোট্ট আমিরকেও ছাড়েনি ইসরাইল** এক মুঠো খাবারের দাম কি মৃত্যু হতে পারে? গাজার ক্ষুধার্ত শিশুদের জন্য এই প্রশ্নটা কোনো গল্প নয়, এটাই ওখানকার কঠিন আর নির্মম বাস্তবতা। আজ আমরা আমিরের গল্প শুনব। যে শিশুটা শুধু একটু খাবারের জন্য ১২ কিলোমিটার পথ খালি পায়ে হেঁটে এসেছিল। তার স্বপ্ন ছিল সামান্য খাবার, কিন্তু তার প্লেটে সেই খাবার ওঠার আগেই ইসরায়েলি বাহিনীর বুলেট তার সব স্বপ্ন কেড়ে নেয়। আমিরের এই গল্প কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটা গাজার হাজারো শিশুর প্রতিদিনের লড়াই আর মর্মান্তিক পরিণতির এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।  (আমিরের মরিয়া যাত্রা) একবার ভাবুন তো সেই শিশুটির কথা, যার পৃথিবীটা আটকে গেছে ধ্বংসস্তূপ আর বারুদের গন্ধে। তার নাম আমির। গাজার অন্য শিশুদের মতোই তার চোখেও স্বপ্ন ছিল, কিন্তু পেটে ছিল তীব্র ক্ষুধা। যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজায় যখন খাবারের অভাব চরমে, তখন একমুঠো খাবারের জন্য তার ছোট্ট দুটি পা এক অসাধ্য সাধনে নামে। অপুষ্টিতে ভোগা শীর্ণ শরীরটাকে টেনে নিয়ে সে হাঁটা শুরু করে। মাথার ওপর গনগনে সূর্য আর পায়ের নিচে ভাঙাচোরা উত্তপ্ত রাস্তা। ১২ কিলোমিটার পথ—যেটা একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের জন্যও কঠিন, সেই পথ সে পাড়ি দিয়েছিল খালি পায়ে। তার এই যাত্রা শুধু খাবারের জন্য ছিল না, ছিল বেঁচে থাকার এক মরিয়া চেষ্টা। জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা বারবার সতর্ক করে বলেছে, গাজা এক ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে। জাতিসংঘ-সমর্থিত ইন্টিগ্রেটেড ফুড সিকিউরিটি ফেইজ ক্লাসিফিকেশন (আইপিসি) তাদের সাম্প্রতিক রিপোর্টে জানিয়েছে যে গাজার বেশিরভাগ এলাকা দুর্ভিক্ষের সীমায় পৌঁছে গেছে এবং ব্যাপক অনাহার আর অপুষ্টিতে মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। এই ভয়াবহ সংকটের মধ্যেই আমিরের মতো শিশুরা প্রতিদিন নিজেদের জীবন বাজি রেখে খাবারের খোঁজে বের হয়। তাদের কাছে ক্ষুধা যেন মৃত্যুর চেয়েও বড় ভয়। আমিরের খালি পায়ের প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল সেই ভয়ংকর বাস্তবতার একেকটি চিহ্ন, যা পুরো বিশ্বের কাছে একটাই প্রশ্ন ছুঁড়ে দিচ্ছিল—এই শিশুদের অপরাধটা  (এক চিলতে আশা) দীর্ঘ আর ক্লান্তিকর পথ পাড়ি দিয়ে আমির শেষ পর্যন্ত একটা ত্রাণ বিতরণ কেন্দ্রের কাছে পৌঁছায়। সেখানে তখন শত শত ক্ষুধার্ত মানুষের ভিড়। বিশৃঙ্খলা আর হাহাকারের মধ্যেই প্রত্যেকে চেষ্টা করছে সামান্য কিছু খাবার জোগাড় করার। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে থাকার পর, তার অপেক্ষার পালা শেষ হয়। তার ছোট্ট দুই হাতে তুলে দেওয়া হয় সামান্য কিছু চাল আর ডাল। সেই মুহূর্তে আমিরের শীর্ণ মুখে যে হাসি ফুটে উঠেছিল, তা ছিল অমূল্য। শত কষ্ট ভুলে সে কৃতজ্ঞতার চোখে পাশে থাকা একজন ত্রাণকর্মীর দিকে তাকিয়েছিল। তার চোখে তখন নতুন স্বপ্ন—এই খাবারটুকু নিয়ে সে বাড়ি ফিরবে, হয়তো অনেক দিন পর তার পরিবারের মুখেও হাসি ফুটবে। সেই মুহূর্তটা ছিল এক ঝলক আলোর মতো। ধ্বংস আর মৃত্যুর উপত্যকায় এক চিলতে আশা। যে শিশুটা ১২ কিলোমিটার পথ খালি পায়ে হেঁটে এসেছে, তার কাছে এই সামান্য খাবারটুকুই ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে বড় পুরস্কার। সে হয়তো ভেবেছিল, তার কষ্ট সার্থক হয়েছে। কিন্তু সে জানত না, গাজার আকাশে আশা আর স্বপ্ন—দুটোই খুব ক্ষণস্থায়ী। সে জানত না, তার এই আনন্দটুকু কেড়ে নেওয়ার জন্য মৃত্যু ঠিক তার পেছনেই অপেক্ষা করছে।  (শিখা নিভে গেল) খাবার হাতে পেয়ে ভিড়ের মধ্য দিয়ে বাড়ির পথ ধরেছিল আমির। কিন্তু কয়েক পা এগোতেই তার চারপাশের পৃথিবীটা যেন কেঁপে উঠল। হঠাৎ শুরু হলো প্রচণ্ড গোলাগুলি। মুহূর্তে আনন্দ আর কোলাহলের জায়গা দখল করে নিল আতঙ্ক আর আর্তনাদ। ক্ষুধার্ত মানুষগুলো জীবন বাঁচাতে দিগ্বিদিক ছুটতে শুরু করে। এটা গাজায় কোনো নতুন দৃশ্য নয়। ত্রাণপ্রার্থীদের ওপর হামলা যেন এক নিয়মিত ও নির্মম বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। এর আগেও বহুবার বিভিন্ন ত্রাণকেন্দ্রের কাছে খাবার সংগ্রহ করতে আসা ক্ষুধার্ত মানুষের ওপর ইসরায়েলি বাহিনীর হামলার ঘটনা ঘটেছে। জাতিসংঘের তথ্যমতে, মে মাসের শেষের দিক থেকে এ পর্যন্ত ত্রাণ সংগ্রহ করতে গিয়েই ১,৩০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। সেই দিনের বিশৃঙ্খলার মধ্যে একটি বুলেট এসে আমিরের ছোট্ট শরীরটাকে এফোঁড়-ওফোঁড় করে দেয়। তার হাত থেকে খাবারের ব্যাগটা ছিটকে পড়ে যায়। যে চাল আর ডালের জন্য সে এত দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়েছিল, তা মিশে যায় রাস্তার ধুলো আর তার রক্তের সঙ্গে। এক মুহূর্তের জন্য যে চোখে স্বপ্ন ছিল, সেই চোখ নিথর হয়ে যায়। আমিরের ১২ কিলোমিটারের যাত্রা শেষ হয়, কিন্তু তার আর ঘরে ফেরা হয় না।  (বৃহত্তর ট্র্যাজেডি: আমিরই প্রতিটি শিশু) আমিরের মৃত্যু কোনো একক ঘটনা নয়, এটি গাজার চলমান মানবিক বিপর্যয়ের একটি অংশ মাত্র, যাকে অনেক মানবাধিকার সংস্থা ও বিশেষজ্ঞ গণহত্যা বলে আখ্যায়িত করেছেন। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুসারে, চলমান সংঘাতে নিহতের সংখ্যা ৬০,০০০ ছাড়িয়েছে। ওয়াশিংটন পোস্টের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিহতদের মধ্যে শিশুর সংখ্যা ১৮,৫০০-এর বেশি, যাদের অনেকের নাম ও বয়স তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। এর মানে হলো, এই যুদ্ধে প্রতি ঘণ্টায় একাধিক শিশুর প্রাণ কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। এই সংকট শুধু বোমার আঘাতেই সীমাবদ্ধ নেই। এটি এমন এক পরিস্থিতি তৈরি করেছে যাকে জাতিসংঘ এবং অন্যান্য সংস্থাগুলো "মানবসৃষ্ট" বিপর্যয় বলছে। জাতিসংঘের খাদ্য নিরাপত্তা সংস্থা আইপিসি সতর্ক করে বলেছে যে গাজায় দুর্ভিক্ষের সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি এখন চোখের সামনেই ঘটছে। অপুষ্টির হার ভয়াবহভাবে বাড়ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) জানিয়েছে, শুধুমাত্র জুলাই ২০২৫-এই অপুষ্টিজনিত কারণে ৬৩ জনের মৃত্যু হয়েছে, যাদের একটা বড় অংশই শিশু। মায়েরা নিজেরাও অপুষ্টিতে ভোগার কারণে শিশুদের বুকের দুধ খাওয়াতে পারছেন না। ফলে শিশুরা কঙ্কালে পরিণত হচ্ছে। ত্রাণ বিতরণ ব্যবস্থাও প্রায় ভেঙে পড়েছে। যে সামান্য ত্রাণ গাজায় ঢুকছে, তা প্রয়োজনের তুলনায় একেবারেই নগণ্য। আর সেই ত্রাণ সংগ্রহ করতে গিয়েও সাধারণ মানুষকে জীবনের ঝুঁকি নিতে হচ্ছে।  (বিশ্বের নীরবতা) আমিরের মতো হাজারো শিশুর আর্তনাদ কি বিশ্বের ক্ষমতাধর নেতাদের কানে পৌঁছাচ্ছে না? যখন একটা শিশুকে একমুঠো খাবারের জন্য প্রাণ দিতে হয়, তখন আন্তর্জাতিক আইন আর মানবাধিকারের কথাগুলো ফাঁপা শোনায়। গাজার শিশুরা যখন ক্ষুধায় কাতরাচ্ছে, তখনও নিরাপত্তা পরিষদে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবে ভেটো দেওয়া হয়, যা এই সংকটকে আরও দীর্ঘায়িত করে। আমরা এমন এক পৃথিবীতে বাস করছি, যেখানে শিশুদের বেঁচে থাকার অধিকারের চেয়ে ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। গাজার প্রতিটি শিশুর মৃত্যু মানবতা এবং বিশ্ববিবেকের মুখে এক একটি চপেটাঘাত। বছরের পর বছর ধরে চলা এই নৃশংসতা দেখেও বিশ্ব সম্প্রদায়ের নীরবতা এক ঐতিহাসিক ব্যর্থতা হিসেবেই চিহ্নিত হয়ে থাকবে। আমরা কি এমন একটি প্রজন্ম হতে চাই, যারা হাজার হাজার শিশুর মৃত্যু অসহায়ভাবে শুধু দেখেই গেছে? এই প্রশ্নটা আজ আমাদের সবার| আমিরের গল্পটা এখানেই শেষ, কিন্তু গাজার হাজারো শিশুর বেঁচে থাকার লড়াই এখনো থামেনি। এই অমানবিকতা নিয়ে সচেতনতা তৈরি করা আমাদের সবার নৈতিক দায়িত্ব। যদি আমিরের এই গল্প আপনার মনে এতটুকুও নাড়া দিয়ে থাকে, তাহলে আর চুপ থাকবেন না। আপনার বন্ধু এবং পরিবারের সঙ্গে শেয়ার করে এই বার্তাটি সবার কাছে পৌঁছে দিন। এই নৃশংসতার বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলুন। কমেন্টে আপনার মতামত জানান। আপনার প্রতিটি শেয়ার হয়তো কারো বিবেককে জাগিয়ে তুলতে সাহায্য করবে। আমির খালি পায়ে হেঁটেছিল খাবারের জন্য, কিন্তু সে ফিরে গেল একরাশ শূন্যতা নিয়ে, চিরতরে। তার ব্যাগ থেকে ঝরে পড়া চাল আর ডালের মতোই গাজার মাটিতে মিশে যাচ্ছে হাজারো শিশুর অপূর্ণ স্বপ্ন। এই বর্বরতার শেষ কোথায়? এই প্রশ্নের উত্তর হয়তো আমাদের সবারই জানা, কিন্তু আমরা তা স্বীকার করতে ভয় পাই। যতক্ষণ না বিশ্ব এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে একসুরে কথা বলছে, ততক্ষণ আমিরের মতো আরও অনেক শিশুকে খাবারের খোঁজে বেরিয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তে হবে।

ডি এস কে টিভি চ্যানেল

চেয়ারম্যান ও সম্পাদকঃ সামসুল আলম
বার্তা সম্পাদকঃ মোঃ আসআদ

কপিরাইট © ২০২৫ ডি এস কে টিভি চ্যানেল