ডি এস কে টিভি চ্যানেল

অর্থ নয়, পড়ার দায়িত্ব নিলেন ডিসি; সাদিয়া পেল জিপিএ-৫

অর্থ নয়, পড়ার দায়িত্ব নিলেন ডিসি; সাদিয়া পেল জিপিএ-৫

অর্থ নয়, পড়ার দায়িত্ব নিলেন ডিসি; সাদিয়া পেল জিপিএ-৫

ডিসির দেওয়া পড়ার রুটিন মেনে জিপিএ-৫ পেল সাদিয়া

অভাবের সংসারে মেয়ের পড়াশোনার খরচ চালাতে হিমশিম খাচ্ছিলেন মা আরফা বেগম। তাই মেয়ের বই কেনার জন্য আর্থিক সহায়তা চেয়ে দিনাজপুরের জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন করেছিলেন তিনি। তবে আবেদন পেয়ে তাৎক্ষণিক টাকা না দিয়ে সাদিয়া আফরিনকে দেওয়া হয় এক সপ্তাহের পড়া ও একটি নির্দিষ্ট পড়াশোনার রুটিন। সেই পড়া নিয়ে প্রতি সপ্তাহে জেলা প্রশাসকের কাছে হাজির হতে বলা হয় তাকে।

জেলা প্রশাসকের দেওয়া সেই নিয়ম মেনে নিয়মিত পড়াশোনা ও সাপ্তাহিক পরীক্ষা দিতে দিতে এক বছর পার করে সাদিয়া। অবশেষে এবারের এসএসসি পরীক্ষায় বিজ্ঞান বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ অর্জন করেছে সে। দিনাজপুর সদর উপজেলার মাসিমপুর সরকারপাড়া এলাকার কাদের বকস মেমোরিয়াল হাই স্কুলের একমাত্র জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থী সাদিয়া।

সাদিয়ার পরিবার সূত্রে জানা যায়, গত বছরের জুলাইয়ে মেয়ের পড়াশোনার জন্য আর্থিক সহায়তা চেয়ে জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন করেন তার মা। পরে সাদিয়াকে সঙ্গে নিয়ে জেলা প্রশাসকের সঙ্গে দেখা করেন তিনি। সেদিন জেলা প্রশাসক মো. রফিকুল ইসলাম সাদিয়ার পড়াশোনা নিয়ে নানা প্রশ্ন করেন। বেশির ভাগ প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেনি সাদিয়া।

এরপর জেলা প্রশাসক তাকে প্রতিদিন রাতে দুই ঘণ্টা এবং ভোরে দুই ঘণ্টা পড়ার রুটিন করে দেন। রাত ১০টায় ঘুমানো ও ভোর ৫টায় ঘুম থেকে ওঠার পাশাপাশি বিকেলে এক ঘণ্টা খেলাধুলা এবং প্রতিদিন বিদ্যালয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন। প্রতি বুধবার গণশুনানির দিন জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে গিয়ে এক সপ্তাহের পড়া বুঝিয়ে দিতে বলা হয়।

শুরু হয় সাদিয়ার নিয়মিত বুধবারের যাত্রা। মানুষের নানা অভিযোগ শোনার ফাঁকে জেলা প্রশাসক তার পড়া নিতেন, ভুলগুলো সংশোধন করে নতুন পড়া দিয়ে দিতেন। এভাবে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ই হয়ে ওঠে সাদিয়ার আরেকটি পাঠশালা। পরে তাকে সাত হাজার টাকা আর্থিক সহায়তাও দেওয়া হয়।

সাদিয়া ও তার পরিবারের বসবাস দিনাজপুর সদর উপজেলার মাসিমপুর সরকারপাড়া এলাকায় দুই শতক জমির ওপর একটি টিনের ঘরে। ঘরে নেই পড়ার টেবিলও। কখনো বিছানায়, আবার কখনো মায়ের সেলাই মেশিনের ওপর বই রেখে পড়াশোনা করতে হয়েছে তাকে।

তার বাবা মো. সেলিম চালকলের শ্রমিক। মা আরফা বেগম সংসারের কাজের পাশাপাশি সেলাইয়ের কাজ করেন। তিন মেয়ের মধ্যে সাদিয়া বড়। সীমিত আয়ে সংসার চালানোর পর তিন মেয়ের পড়াশোনার খরচ জোগানো তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছিল।

সাদিয়া বলে, ‘স্যারের কাছে পড়া দিতে প্রথম দিকে ভয় পেতাম; কিন্তু পড়াগুলো নিয়মিত করতাম। আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি স্যার অনেক সাহস দিয়েছেন।’

এবারের এসএসসি পরীক্ষায় কাদের বকস মেমোরিয়াল হাই স্কুল থেকে ৪৩ জন শিক্ষার্থী অংশ নেয়। এর মধ্যে ২২ জন পাস করেছে। তাদের মধ্যে একমাত্র সাদিয়াই জিপিএ-৫ পেয়েছে।

ফল প্রকাশের পর সাদিয়ার পরিবার জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে গেলে জেলা প্রশাসক রফিকুল ইসলাম তাকে অভিনন্দন জানান এবং মিষ্টিমুখ করান।

জেলা প্রশাসক বলেন, প্রথম দিন সাদিয়ার সঙ্গে কথা বলে তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, মেয়েটির পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ রয়েছে। তাই তাকে একটি চ্যালেঞ্জ দেওয়া হয়েছিল। সাদিয়া সত্যিই নিয়ম মেনে পড়াশোনা ও দেওয়া বাড়ির কাজ শেষ করেছে।

সাদিয়ার মা আরফা বেগম বলেন, ‘মেয়ের বই কেনার জন্য আর্থিক সহযোগিতা চেয়ে ডিসি স্যারের কাছে আবেদন করেছিলাম। স্যার আমাদের সহযোগিতা করেছেন। শুধু অর্থ দিয়ে নয়, মেয়েকে নিয়মিত পড়া দিয়েছেন, পড়া নিয়েছেন, খোঁজখবর নিয়েছেন। আজকে মেয়েটা ভালো রেজাল্ট করেছে।’

সাদিয়ার স্বপ্ন পড়ালেখা শেষ করে সরকারি চাকরি করা এবং অভাবের সংসারের হাল ধরা। তবে মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় বাবা সেলিম। তিনি বলেন, মেয়ে অনেক দূর পর্যন্ত পড়তে চায়, কিন্তু কতদূর পর্যন্ত তাকে পড়াতে পারবেন, তা নিয়ে চিন্তায় আছেন।

আপনার মতামত লিখুন

পরবর্তী খবর
ডি এস কে টিভি চ্যানেল

বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট ২০২৬


অর্থ নয়, পড়ার দায়িত্ব নিলেন ডিসি; সাদিয়া পেল জিপিএ-৫

প্রকাশের তারিখ : ২০ আগস্ট ২০২৬

featured Image

অর্থ নয়, পড়ার দায়িত্ব নিলেন ডিসি; সাদিয়া পেল জিপিএ-৫

ডিসির দেওয়া পড়ার রুটিন মেনে জিপিএ-৫ পেল সাদিয়া

অভাবের সংসারে মেয়ের পড়াশোনার খরচ চালাতে হিমশিম খাচ্ছিলেন মা আরফা বেগম। তাই মেয়ের বই কেনার জন্য আর্থিক সহায়তা চেয়ে দিনাজপুরের জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন করেছিলেন তিনি। তবে আবেদন পেয়ে তাৎক্ষণিক টাকা না দিয়ে সাদিয়া আফরিনকে দেওয়া হয় এক সপ্তাহের পড়া ও একটি নির্দিষ্ট পড়াশোনার রুটিন। সেই পড়া নিয়ে প্রতি সপ্তাহে জেলা প্রশাসকের কাছে হাজির হতে বলা হয় তাকে।

জেলা প্রশাসকের দেওয়া সেই নিয়ম মেনে নিয়মিত পড়াশোনা ও সাপ্তাহিক পরীক্ষা দিতে দিতে এক বছর পার করে সাদিয়া। অবশেষে এবারের এসএসসি পরীক্ষায় বিজ্ঞান বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ অর্জন করেছে সে। দিনাজপুর সদর উপজেলার মাসিমপুর সরকারপাড়া এলাকার কাদের বকস মেমোরিয়াল হাই স্কুলের একমাত্র জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থী সাদিয়া।

সাদিয়ার পরিবার সূত্রে জানা যায়, গত বছরের জুলাইয়ে মেয়ের পড়াশোনার জন্য আর্থিক সহায়তা চেয়ে জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন করেন তার মা। পরে সাদিয়াকে সঙ্গে নিয়ে জেলা প্রশাসকের সঙ্গে দেখা করেন তিনি। সেদিন জেলা প্রশাসক মো. রফিকুল ইসলাম সাদিয়ার পড়াশোনা নিয়ে নানা প্রশ্ন করেন। বেশির ভাগ প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেনি সাদিয়া।

এরপর জেলা প্রশাসক তাকে প্রতিদিন রাতে দুই ঘণ্টা এবং ভোরে দুই ঘণ্টা পড়ার রুটিন করে দেন। রাত ১০টায় ঘুমানো ও ভোর ৫টায় ঘুম থেকে ওঠার পাশাপাশি বিকেলে এক ঘণ্টা খেলাধুলা এবং প্রতিদিন বিদ্যালয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন। প্রতি বুধবার গণশুনানির দিন জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে গিয়ে এক সপ্তাহের পড়া বুঝিয়ে দিতে বলা হয়।

শুরু হয় সাদিয়ার নিয়মিত বুধবারের যাত্রা। মানুষের নানা অভিযোগ শোনার ফাঁকে জেলা প্রশাসক তার পড়া নিতেন, ভুলগুলো সংশোধন করে নতুন পড়া দিয়ে দিতেন। এভাবে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ই হয়ে ওঠে সাদিয়ার আরেকটি পাঠশালা। পরে তাকে সাত হাজার টাকা আর্থিক সহায়তাও দেওয়া হয়।

সাদিয়া ও তার পরিবারের বসবাস দিনাজপুর সদর উপজেলার মাসিমপুর সরকারপাড়া এলাকায় দুই শতক জমির ওপর একটি টিনের ঘরে। ঘরে নেই পড়ার টেবিলও। কখনো বিছানায়, আবার কখনো মায়ের সেলাই মেশিনের ওপর বই রেখে পড়াশোনা করতে হয়েছে তাকে।

তার বাবা মো. সেলিম চালকলের শ্রমিক। মা আরফা বেগম সংসারের কাজের পাশাপাশি সেলাইয়ের কাজ করেন। তিন মেয়ের মধ্যে সাদিয়া বড়। সীমিত আয়ে সংসার চালানোর পর তিন মেয়ের পড়াশোনার খরচ জোগানো তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছিল।

সাদিয়া বলে, ‘স্যারের কাছে পড়া দিতে প্রথম দিকে ভয় পেতাম; কিন্তু পড়াগুলো নিয়মিত করতাম। আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি স্যার অনেক সাহস দিয়েছেন।’

এবারের এসএসসি পরীক্ষায় কাদের বকস মেমোরিয়াল হাই স্কুল থেকে ৪৩ জন শিক্ষার্থী অংশ নেয়। এর মধ্যে ২২ জন পাস করেছে। তাদের মধ্যে একমাত্র সাদিয়াই জিপিএ-৫ পেয়েছে।

ফল প্রকাশের পর সাদিয়ার পরিবার জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে গেলে জেলা প্রশাসক রফিকুল ইসলাম তাকে অভিনন্দন জানান এবং মিষ্টিমুখ করান।

জেলা প্রশাসক বলেন, প্রথম দিন সাদিয়ার সঙ্গে কথা বলে তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, মেয়েটির পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ রয়েছে। তাই তাকে একটি চ্যালেঞ্জ দেওয়া হয়েছিল। সাদিয়া সত্যিই নিয়ম মেনে পড়াশোনা ও দেওয়া বাড়ির কাজ শেষ করেছে।

সাদিয়ার মা আরফা বেগম বলেন, ‘মেয়ের বই কেনার জন্য আর্থিক সহযোগিতা চেয়ে ডিসি স্যারের কাছে আবেদন করেছিলাম। স্যার আমাদের সহযোগিতা করেছেন। শুধু অর্থ দিয়ে নয়, মেয়েকে নিয়মিত পড়া দিয়েছেন, পড়া নিয়েছেন, খোঁজখবর নিয়েছেন। আজকে মেয়েটা ভালো রেজাল্ট করেছে।’

সাদিয়ার স্বপ্ন পড়ালেখা শেষ করে সরকারি চাকরি করা এবং অভাবের সংসারের হাল ধরা। তবে মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় বাবা সেলিম। তিনি বলেন, মেয়ে অনেক দূর পর্যন্ত পড়তে চায়, কিন্তু কতদূর পর্যন্ত তাকে পড়াতে পারবেন, তা নিয়ে চিন্তায় আছেন।


ডি এস কে টিভি চ্যানেল

চেয়ারম্যান ও সম্পাদকঃ সামসুল আলম
বার্তা সম্পাদকঃ মোঃ আসআদ

কপিরাইট © ২০২৫ ডি এস কে টিভি চ্যানেল