ডি এস কে টিভি চ্যানেল
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৫

আমরা যুদ্ধের আগুন থেকে বেঁচে ফিরেছি, কিন্তু এই ‘যুদ্ধবিরতি’ হয়তো আমাদের শেষ করে দেবে

আমরা যুদ্ধের আগুন থেকে বেঁচে ফিরেছি, কিন্তু এই ‘যুদ্ধবিরতি’ হয়তো আমাদের শেষ করে দেবে
আমরা যুদ্ধের আগুন থেকে বেঁচে ফিরেছি, কিন্তু এই ‘যুদ্ধবিরতি’ হয়তো আমাদের শেষ করে দেবে রবিবার সকালে আমি গাজার মধ্যাঞ্চলের আজ-জাওয়ায়দা এলাকার অস্থায়ী তাঁবু থেকে বেরিয়ে পড়লাম। গন্তব্য ছিল পাশের একটি ছোট্ট ক্যাফে— টুইক্স, যেখানে ফ্রিল্যান্সার ও তরুণ শিক্ষার্থীরা কাজ করে। যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর দশ দিন পেরিয়ে গেছে; মনে হলো, হয়তো এখন কিছুটা নিরাপদ সময়। ভাবলাম, হয়তো জীবনের ছিন্ন অংশটা একটু হলেও ছুঁয়ে দেখা যাবে। কিন্তু সে আশাও বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। আমি আর আমার ভাই যখন ক্যাফের দরজার কাছে পৌঁছেছি, তখন হঠাৎ করেই এক প্রচণ্ড বিস্ফোরণের শব্দ কানে এলো। মুহূর্তেই বুঝে ফেললাম— এটা ড্রোন হামলার আওয়াজ! ইসরায়েলি একটি ড্রোন টুইক্স ক্যাফের সামনের প্রবেশপথেই আঘাত হেনেছে। আমার চোখের সামনে ধোঁয়া আর ধ্বংসের দৃশ্য— তিনজন প্রাণ হারিয়েছেন, আরও অনেকে আহত। আমি আর আমার ভাই যদি কয়েক মিনিট আগে তাঁবু থেকে বের হতাম, হয়তো আজ এই কথাগুলো লেখার মতো জীবিতও থাকতাম না। পরিবারে তখন হাহাকার। ফোনে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করছিল সবাই, কিন্তু দুর্বল সিগন্যালের কারণে কোনো সংযোগই হচ্ছিল না। তাঁবুতে ফিরে আসার পরই মায়ের চোখে স্বস্তির জল দেখলাম। কিন্তু আমার মনে তখন প্রশ্ন— এ কেমন যুদ্ধবিরতি? এ কোন শান্তি, যেখানে মৃত্যু প্রতিদিন দরজায় কড়া নাড়ে? বিদেশি নেতারা যখন বললেন “যুদ্ধ শেষ”, আমরা ভেবেছিলাম হয়তো কিছুটা আলো ফিরবে, হয়তো আবার ঘর পুনর্গঠনের চেষ্টা শুরু হবে। কিন্তু না— দখলদারিত্বের এই বাস্তবতায় শান্তি শুধু কাগজের শব্দ মাত্র। সেদিন টুইক্স ক্যাফেতে হামলার সঙ্গে গাজাজুড়ে আরও ডজনখানেক স্থানে বোমাবর্ষণ হয়, প্রাণ হারান অন্তত ৪৫ জন। তথাকথিত এই যুদ্ধবিরতির পর থেকেই প্রতিদিন রক্ত ঝরছে। ইতোমধ্যে ১০০ জনেরও বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে ছিল আবু শাবান পরিবারের ১১ জন সদস্য— চারজন প্রাপ্তবয়স্ক ও সাতটি শিশু। ১৮ অক্টোবর, তারা যখন গাজা সিটির জেইতুন এলাকায় নিজেদের বাড়িতে ফেরার চেষ্টা করছিল, এক মুহূর্তেই ইসরায়েলি বোমা তাদের সবাইকে ছিন্নভিন্ন করে দেয়। এটাই কি যুদ্ধবিরতি? নাকি কেবল মৃত্যুর নতুন নাম? যেদিন আবার বোমা পড়তে শুরু করল, সেদিন মানুষ আতঙ্কে বাজারে ছুটল— হয়তো শেষবারের মতো কিছু খাবার জোগাড় করার জন্য। এক হাতে শিশুকে আঁকড়ে ধরে, অন্য হাতে রুটি কেনার লড়াই; চারদিকে আগুন, মাথার ওপরে ড্রোন। আমরা এখন এমন এক জায়গায় দাঁড়িয়ে আছি, যেখানে “নিরাপত্তা” বা “আগামীকাল” শব্দ দুটি মানেই বিলাসিতা। ইসরায়েল শুধু আকাশে বোমা ফেলছে না, মাটিতেও অনাহার নামিয়ে আনছে। যুদ্ধবিরতির পর প্রতিদিন ৬০০টি ত্রাণবাহী ট্রাক গাজায় ঢোকার কথা থাকলেও, ১৫ দিনে এসেছে মাত্র ৯৮৬টি— প্রতিশ্রুতির অল্প একাংশ। ডব্লিউএফপি জানিয়েছে, তাদের অর্ধেকেরও কম ট্রাক ঢুকতে পেরেছে। ইউএনআরডব্লিউএ’র ৬,০০০ ট্রাক সীমান্তে আটকা পড়ে আছে— একটিও প্রবেশ করতে পারেনি। সালাহ আল-দ্বীন সড়ক এখনো বন্ধ, ফলে গাজার উত্তরাঞ্চল কার্যত অনাহারে। রাফাহ সীমান্তও আগের মতোই অচল— যেন পুরো গাজা এক বিশাল খোলা কারাগার। আজ বুঝি, ইসরায়েলের কাছে “যুদ্ধবিরতি” মানে শুধু একটি বোতাম— ইচ্ছে হলে বন্ধ করে, আবার ইচ্ছে হলে চালু করে দেয়। একদিন ভোরে বোমা বর্ষণ, পরদিন ঘোষণা— “যুদ্ধবিরতি কার্যকর”। যেন ৪৫টি প্রাণের মৃত্যু কিছুই না, যেন ধ্বংস হওয়া ঘরবাড়িগুলোর কোনো অস্তিত্বই ছিল না। সবচেয়ে কষ্ট হয় এই ভাবনায়— আমাদের জীবন যেন তাদের কাছে সংখ্যার বেশি কিছু নয়। যেকোনো মুহূর্তে তারা আবার এই নরকযজ্ঞ শুরু করতে পারে, কোনো কারণ ছাড়াই। এই যুদ্ধবিরতি আসলে এক অদৃশ্য যুদ্ধের সামান্য বিরতি মাত্র— এক নিঃশব্দ নিঃশ্বাস, যা আবারও বিস্ফোরণে ভেঙে পড়বে। আমরা এখন কেবল একটাই আশায় বেঁচে আছি— বিশ্ব একদিন আমাদের বাঁচার অধিকারকে স্বীকার করবে, শুধু কথায় নয়, কাজে। ততদিন পর্যন্ত আমরা হয়তো সংবাদপত্রের একটি সংখ্যা হয়ে থাকব— নামহীন, রক্তাক্ত, অথচ এখনো টিকে থাকা এক জাতি।

আপনার মতামত লিখুন

পরবর্তী খবর
ডি এস কে টিভি চ্যানেল

শনিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৬


আমরা যুদ্ধের আগুন থেকে বেঁচে ফিরেছি, কিন্তু এই ‘যুদ্ধবিরতি’ হয়তো আমাদের শেষ করে দেবে

প্রকাশের তারিখ : ২৮ অক্টোবর ২০২৫

featured Image
আমরা যুদ্ধের আগুন থেকে বেঁচে ফিরেছি, কিন্তু এই ‘যুদ্ধবিরতি’ হয়তো আমাদের শেষ করে দেবে রবিবার সকালে আমি গাজার মধ্যাঞ্চলের আজ-জাওয়ায়দা এলাকার অস্থায়ী তাঁবু থেকে বেরিয়ে পড়লাম। গন্তব্য ছিল পাশের একটি ছোট্ট ক্যাফে— টুইক্স, যেখানে ফ্রিল্যান্সার ও তরুণ শিক্ষার্থীরা কাজ করে। যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর দশ দিন পেরিয়ে গেছে; মনে হলো, হয়তো এখন কিছুটা নিরাপদ সময়। ভাবলাম, হয়তো জীবনের ছিন্ন অংশটা একটু হলেও ছুঁয়ে দেখা যাবে। কিন্তু সে আশাও বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। আমি আর আমার ভাই যখন ক্যাফের দরজার কাছে পৌঁছেছি, তখন হঠাৎ করেই এক প্রচণ্ড বিস্ফোরণের শব্দ কানে এলো। মুহূর্তেই বুঝে ফেললাম— এটা ড্রোন হামলার আওয়াজ! ইসরায়েলি একটি ড্রোন টুইক্স ক্যাফের সামনের প্রবেশপথেই আঘাত হেনেছে। আমার চোখের সামনে ধোঁয়া আর ধ্বংসের দৃশ্য— তিনজন প্রাণ হারিয়েছেন, আরও অনেকে আহত। আমি আর আমার ভাই যদি কয়েক মিনিট আগে তাঁবু থেকে বের হতাম, হয়তো আজ এই কথাগুলো লেখার মতো জীবিতও থাকতাম না। পরিবারে তখন হাহাকার। ফোনে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করছিল সবাই, কিন্তু দুর্বল সিগন্যালের কারণে কোনো সংযোগই হচ্ছিল না। তাঁবুতে ফিরে আসার পরই মায়ের চোখে স্বস্তির জল দেখলাম। কিন্তু আমার মনে তখন প্রশ্ন— এ কেমন যুদ্ধবিরতি? এ কোন শান্তি, যেখানে মৃত্যু প্রতিদিন দরজায় কড়া নাড়ে? বিদেশি নেতারা যখন বললেন “যুদ্ধ শেষ”, আমরা ভেবেছিলাম হয়তো কিছুটা আলো ফিরবে, হয়তো আবার ঘর পুনর্গঠনের চেষ্টা শুরু হবে। কিন্তু না— দখলদারিত্বের এই বাস্তবতায় শান্তি শুধু কাগজের শব্দ মাত্র। সেদিন টুইক্স ক্যাফেতে হামলার সঙ্গে গাজাজুড়ে আরও ডজনখানেক স্থানে বোমাবর্ষণ হয়, প্রাণ হারান অন্তত ৪৫ জন। তথাকথিত এই যুদ্ধবিরতির পর থেকেই প্রতিদিন রক্ত ঝরছে। ইতোমধ্যে ১০০ জনেরও বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে ছিল আবু শাবান পরিবারের ১১ জন সদস্য— চারজন প্রাপ্তবয়স্ক ও সাতটি শিশু। ১৮ অক্টোবর, তারা যখন গাজা সিটির জেইতুন এলাকায় নিজেদের বাড়িতে ফেরার চেষ্টা করছিল, এক মুহূর্তেই ইসরায়েলি বোমা তাদের সবাইকে ছিন্নভিন্ন করে দেয়। এটাই কি যুদ্ধবিরতি? নাকি কেবল মৃত্যুর নতুন নাম? যেদিন আবার বোমা পড়তে শুরু করল, সেদিন মানুষ আতঙ্কে বাজারে ছুটল— হয়তো শেষবারের মতো কিছু খাবার জোগাড় করার জন্য। এক হাতে শিশুকে আঁকড়ে ধরে, অন্য হাতে রুটি কেনার লড়াই; চারদিকে আগুন, মাথার ওপরে ড্রোন। আমরা এখন এমন এক জায়গায় দাঁড়িয়ে আছি, যেখানে “নিরাপত্তা” বা “আগামীকাল” শব্দ দুটি মানেই বিলাসিতা। ইসরায়েল শুধু আকাশে বোমা ফেলছে না, মাটিতেও অনাহার নামিয়ে আনছে। যুদ্ধবিরতির পর প্রতিদিন ৬০০টি ত্রাণবাহী ট্রাক গাজায় ঢোকার কথা থাকলেও, ১৫ দিনে এসেছে মাত্র ৯৮৬টি— প্রতিশ্রুতির অল্প একাংশ। ডব্লিউএফপি জানিয়েছে, তাদের অর্ধেকেরও কম ট্রাক ঢুকতে পেরেছে। ইউএনআরডব্লিউএ’র ৬,০০০ ট্রাক সীমান্তে আটকা পড়ে আছে— একটিও প্রবেশ করতে পারেনি। সালাহ আল-দ্বীন সড়ক এখনো বন্ধ, ফলে গাজার উত্তরাঞ্চল কার্যত অনাহারে। রাফাহ সীমান্তও আগের মতোই অচল— যেন পুরো গাজা এক বিশাল খোলা কারাগার। আজ বুঝি, ইসরায়েলের কাছে “যুদ্ধবিরতি” মানে শুধু একটি বোতাম— ইচ্ছে হলে বন্ধ করে, আবার ইচ্ছে হলে চালু করে দেয়। একদিন ভোরে বোমা বর্ষণ, পরদিন ঘোষণা— “যুদ্ধবিরতি কার্যকর”। যেন ৪৫টি প্রাণের মৃত্যু কিছুই না, যেন ধ্বংস হওয়া ঘরবাড়িগুলোর কোনো অস্তিত্বই ছিল না। সবচেয়ে কষ্ট হয় এই ভাবনায়— আমাদের জীবন যেন তাদের কাছে সংখ্যার বেশি কিছু নয়। যেকোনো মুহূর্তে তারা আবার এই নরকযজ্ঞ শুরু করতে পারে, কোনো কারণ ছাড়াই। এই যুদ্ধবিরতি আসলে এক অদৃশ্য যুদ্ধের সামান্য বিরতি মাত্র— এক নিঃশব্দ নিঃশ্বাস, যা আবারও বিস্ফোরণে ভেঙে পড়বে। আমরা এখন কেবল একটাই আশায় বেঁচে আছি— বিশ্ব একদিন আমাদের বাঁচার অধিকারকে স্বীকার করবে, শুধু কথায় নয়, কাজে। ততদিন পর্যন্ত আমরা হয়তো সংবাদপত্রের একটি সংখ্যা হয়ে থাকব— নামহীন, রক্তাক্ত, অথচ এখনো টিকে থাকা এক জাতি।

ডি এস কে টিভি চ্যানেল

চেয়ারম্যান ও সম্পাদকঃ সামসুল আলম
বার্তা সম্পাদকঃ মোঃ আসআদ

কপিরাইট © ২০২৫ ডি এস কে টিভি চ্যানেল