এই দেশ যেন চরমপন্থা ও মৌলবাএদের অভয়ারণ্য না হয়
প্রকাশের তারিখ : ১৭ আগস্ট ২০২৫
এই দেশ যেন চরমপন্থা ও মৌলবাএদের অভয়ারণ্য না হয়
"এই দেশে যেন কোনো দিন কোন চরমপন্থা বা মৌলবাদের অভয়ারণ্যে পরিণত হতে না পারে, সেটিও আমাদের প্রত্যাশা, সেটি আমাদের লক্ষ্য।"
কথাগুলো বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের। লন্ডন থেকে যখনই তিনি বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে মুখ খোলেন, তখন তার প্রতিটি শব্দ নিয়ে শুরু হয় চুলচেরা বিশ্লেষণ। কিন্তু এবারের এই হুঁশিয়ারিটা কি একটু ভিন্ন? চরমপন্থা আর মৌলবাদের যে বিপদের কথা তিনি বলছেন, সেটা কি শুধুই একটা রাজনৈতিক চাল? প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলার কোনো নতুন খেলা? নাকি বাংলাদেশের ভেতরে সত্যিই এমন কোনো সংকট দানা বাঁধছে, যার আঁচ পেয়েই তিনি এই সতর্কবার্তা দিচ্ছেন?
তারেক রহমানের এই কথার পেছনের আসল পলিটিক্সটা কী? চলুন, এই ভিডিওতে তার বক্তব্যের গভীরতা আর দেশের বর্তমান পরিস্থিতি মিলিয়ে আসল সত্যটা খোঁজার চেষ্টা করি।
বাংলাদেশের রাজনীতি এখন এক জটিল আর অস্থিতিশীল সময়ের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। একটা দীর্ঘ কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসানের পর দেশ যখন গণতন্ত্রের পথে ফেরার চেষ্টা করছে, ঠিক তখনই বাতাসে ভাসছে নানা গুঞ্জন—কিছু শঙ্কার, কিছু সম্ভাবনার। এমনই এক সময়ে, যখন একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আগামী নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন তারেক রহমানের এই বক্তব্য নতুন এক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
বিএনপির সমর্থকরা বলছেন, এটা একজন দূরদর্শী নেতার কাছ থেকে আসা সময়মতো সতর্কবার্তা। অন্যদিকে, তার বিরোধীরা এর মধ্যে সেই পুরোনো ক্ষমতা দখলের কৌশলেরই গন্ধ পাচ্ছেন। কিন্তু সাধারণ মানুষ কী ভাবছে? দেশ কি আসলেই চরমপন্থা আর মৌলবাদের ঝুঁকির মুখে? এই আলোচনায় আমরা কোনো পক্ষ নেব না। বরং একজন পর্যবেক্ষকের চোখে পুরো বিষয়টা বোঝার চেষ্টা করব। আমরা দেখব, এই বক্তব্যের পেছনে কী কী কারণ থাকতে পারে আর দেশের বাস্তবতার সাথে এর মিলই বা কতটুকু।
১: বক্তব্যের গভীরে - তারেক রহমান আসলে কী বলছেন?**
তারেক রহমানের বক্তব্যটা একটু ভালোভাবে খেয়াল করলে কয়েকটা বিষয় পরিষ্কার হয়। প্রথমত, তিনি শুধু চরমপন্থা বা মৌলবাদের কথা বলেননি। এর সাথে তিনি ফ্যাসিবাদ বা স্বৈরাচারের ফিরে আসার আশঙ্কাকেও জুড়ে দিয়েছেন। অর্থাৎ, তিনি বোঝাতে চাইছেন—এই তিনটি বিপদ আসলে একটির সাথে আরেকটি জড়িত। তার কথা হলো, যদি দেশে একটি জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা তৈরি না করা যায়, যেখানে মানুষের ভোটের অধিকার আর কথা বলার স্বাধীনতা থাকবে, তাহলে এই ধরনের উগ্র শক্তিগুলোই মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে।
আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এই বিপদ ঠেকাতে তিনি বিশেষভাবে নারী সমাজকে সাহসের সাথে এগিয়ে আসার ডাক দিয়েছেন। বিভিন্ন আলোচনায় তিনি বারবার ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলনে নারীদের অবদানের কথা মনে করিয়ে দিয়ে বলেছেন, নারীদের নিরাপত্তাহীন রেখে দেশকে এগিয়ে নেওয়া অসম্ভব। তিনি নিজের মা, স্ত্রী ও কন্যার কথা তুলে ধরে বলেছেন যে, প্রত্যেক নারীরই পুরুষের সমান মর্যাদা, সুরক্ষা আর সুযোগ পাওয়া উচিত। এটা কিন্তু একটা দারুণ তাৎপর্যপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা। এর মাধ্যমে তিনি একদিকে দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে সরাসরি তার রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত করতে চাইছেন, অন্যদিকে একটা প্রগতিশীল সমাজ তৈরির প্রতিশ্রুতিও দিচ্ছেন।
আর সবশেষে, তিনি কবি, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবীদের কাছে লেখার স্বাধীনতা আর সমালোচনার অধিকার রক্ষার জন্য এক হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। এতে বোঝা যায়, তিনি শুধু ক্ষমতার পালাবদল নিয়ে ভাবছেন না, বরং একটা দীর্ঘমেয়াদী সাংস্কৃতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের কথাও ভাবছেন—যেখানে ভিন্নমতকে দমন না করে সম্মান করা হবে।
কাজেই, তারেক রহমানের এই কথাগুলোকে শুধু একটা রাজনৈতিক হুঁশিয়ারি হিসেবে দেখলে এর আসল গভীরতা বোঝা যাবে না। এর ভেতরে লুকিয়ে আছে আগামী দিনের বাংলাদেশ নিয়ে তার দলের পরিকল্পনা, নারী ক্ষমতায়নের প্রতিশ্রুতি এবং একটি সত্যিকারের গণতান্ত্রিক সমাজ গড়ার আহ্ব২:
রাজনৈতিক খেলা - কেন ঠিক এখন এই কথা?**
যেকোনো বড় নেতার বক্তব্যেরই একটা রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট থাকে। তারেক রহমানের এই হুঁশিয়ারিও তার বাইরে নয়। প্রশ্ন হলো, কেন তিনি ঠিক এই সময়ে চরমপন্থা আর মৌলবাদের বিপদ নিয়ে এতটা সোচ্চার? এর পেছনে কয়েকটি রাজনৈতিক হিসাব কাজ করতে পারে।
প্রথমত, এটা প্রতিপক্ষকে এক ধরনের নৈতিক চাপে ফেলার চেষ্টা। দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগ সরকার বিএনপির বিরুদ্ধে জঙ্গিবাদে মদদ দেওয়ার অভিযোগ করে এসেছে। এখন ক্ষমতার পালাবদলের পর, তারেক রহমান নিজেই যখন চরমপন্থার বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় গলায় কথা বলছেন, তখন তিনি আসলে পুরো ন্যারেটিভটাই ঘুরিয়ে দিতে চাইছেন। তিনি এই বার্তা দিচ্ছেন যে, বিএনপি নয়, বরং একটা অগণতান্ত্রিক পরিবেশই চরমপন্থা তৈরির জন্য দায়ী, যে পরিবেশটা আগের সরকারই তৈরি করেছিল।
দ্বিতীয়ত, এই বক্তব্যের একটা বড় টার্গেট হলো আন্তর্জাতিক মহল। পশ্চিমা দেশগুলো বা প্রতিবেশী ভারত, সবাই বাংলাদেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আর উগ্রবাদের উত্থান নিয়ে চিন্তিত। নিউইয়র্ক টাইমসের মতো আন্তর্জাতিক মিডিয়াতেও বাংলাদেশে ধর্মীয় উগ্রপন্থার উত্থানের আশঙ্কা নিয়ে রিপোর্ট হয়েছে। এমন একটা পরিস্থিতিতে, বিএনপির শীর্ষ নেতা যখন চরমপন্থার বিরুদ্ধে তার দলের জিরো-টলারেন্সের কথা বলেন, তখন সেটা আন্তর্জাতিক পার্টনারদের কাছে একটা ইতিবাচক সংকেত দেয়। এর মাধ্যমে তিনি বোঝাতে চাইছেন, বিএনপি ক্ষমতায় এলে বাংলাদেশ একটি সহনশীল ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রই থাকবে।
তৃতীয়ত, এটা দলের ভেতরের নেতাকর্মী এবং সম্ভাব্য মিত্রদের জন্য একটা স্পষ্ট সিগন্যাল। একটা বড় আন্দোলনের পর এখন অনেক ধরনের વિચારধারার দল বা গোষ্ঠী মাঠে সক্রিয়। এদের মধ্যে কিছু ইসলামপন্থী দলও আছে, যাদের কারও কারও বিরুদ্ধে অতীতে উগ্রবাদের অভিযোগ ছিল। তারেক রহমান এই বক্তব্যের মাধ্যমে একটা পরিষ্কার লাইন টেনে দিচ্ছেন। তিনি বুঝিয়ে দিচ্ছেন যে, ভবিষ্যতে বিএনপির নেতৃত্বে কোনো সরকার হলে, সেখানে চরমপন্থা বা মৌলবাদের কোনো জায়গা হবে না। এটা একদিকে যেমন দলের উদারপন্থীদের স্বস্তি দেয়, তেমনই জোটের রাজনীতির জন্য নিজেদের অবস্থানও পরিষ্কার করে।
এবং চতুর্থত, নারীদের সামনে নিয়ে আসাটা একটা খুবই স্মার্ট রাজনৈতিক কৌশল। তিনি জানেন, বাংলাদেশের মোট ভোটারের প্রায় অর্ধেকই নারী এবং ভোটের ফলাফল বদলে দেওয়ার ক্ষমতা তাদের হাতে। তাই নারীদের নিরাপত্তা, ক্ষমতায়ন আর অধিকারের কথা বলে তিনি সরাসরি এই বিশাল জনগোষ্ঠীর সমর্থন পেতে চাইছেন।
সুতরাং, তারেক রহমানের এই বক্তব্যকে একটা বিচ্ছিন্ন কথা ভাবার কোনো কারণ নেই। এটা একটা বহুস্তরীয় রাজনৈতিক কৌশলের অংশ, যার মূল লক্ষ্য হলো—জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে নিজের ও দলের ইমেজ পুনরুদ্ধার করা এবং আগামী নির্বাচনের জন্য মাঠ গোছানো।
৩: আসল পরিস্থিতি - দেশ কি সত্যিই ঝুঁকির মধ্যে?**
রাজনৈতিক কৌশল যা-ই হোক, মূল প্রশ্নটা হলো, তারেক রহমানের এই ভয়টা কি সত্যি? বাংলাদেশে কি আসলেই চরমপন্থা আর মৌলবাদের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে?
২০১৬ সালের হোলি আর্টিজান বেকারির সেই ভয়াবহ হামলার স্মৃতি আমরা কেউই ভুলিনি। ওই ঘটনার পর তৎকালীন সরকার জঙ্গিবাদ দমনে বড় ধরনের অভিযান চালিয়েছিল। কিন্তু নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলেন, অভিযান দিয়ে উগ্রবাদকে হয়তো সাময়িকভাবে থামানো যায়, কিন্তু এর শেকড় উপড়ে ফেলা যায় না। রাজনৈতিক অস্থিরতা, বিভেদ আর গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল হয়ে পড়লে উগ্রবাদীরা ঠিকই গোপনে সংগঠিত হওয়ার সুযোগ পায়।
সাম্প্রতিক সময়ে, বিশেষ করে ক্ষমতার পালাবদলের পর, এই উদ্বেগ যেন আরও বেড়েছে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে, অতীতে নিষিদ্ধ ছিল এমন কিছু সংগঠন আবারও প্রকাশ্যে মিছিল-মিটিং করার চেষ্টা করছে এবং ইসলামি খেলাফত প্রতিষ্ঠার মতো স্লোগান দিচ্ছে। কক্সবাজারে পোশাকের জন্য এক তরুণীকে হেনস্তা করা বা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে যুগলের ছবি তুলে 'সোশ্যাল পুলিশিং'-এর নামে ছড়িয়ে দেওয়ার মতো ঘটনাগুলো সমাজে অসহিষ্ণুতা বাড়ারই ইঙ্গিত দেয়।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) আ ন ম মুনীরুজ্জামান যেমনটা বলেছেন, "উগ্রবাদ এখনো মাথাচাড়া দিয়ে ওঠেনি। তবে ওঠার চেষ্টা করছে। এই প্রবণতাকে অঙ্কুরেই বিনষ্ট করতে হবে।" নিউইয়র্ক টাইমসের রিপোর্টেও একই ধরনের আশঙ্কার কথা বলা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, রাজনৈতিক শূন্যতার সুযোগে ধর্মীয় কট্টরপন্থীরা প্রকাশ্যে আসছে এবং নারীদের অধিকার কেড়ে নেওয়ার মতো কথা বলছে। যদিও অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এই রিপোর্টকে একপেশে বলেছে, কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই ধরনের ঘটনা সাধারণ মানুষের মনে ঠিকই উদ্বেগ তৈরি করছে।
এই অবস্থায়, তারেক রহমানের হুঁশিয়ারিকে পুরোপুরি অমূলক বলা চলে না। একটা অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশে, যখন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোই নিজেদের গুছিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়ায় আছে, তখন যেকোনো উগ্র মতবাদ খুব সহজেই ছড়িয়ে পড়তে পারে। বিশেষ করে, যখন রাজনৈতিক দলগুলো একে অপরের বিরুদ্ধে প্রতিহিংসায় ব্যস্ত থাকে, তখন মূল সমস্যা সমাধান করার চেয়ে দোষারোপের রাজনীতিই বড় হয়ে ওঠে, যা পরিস্থিতিকে আরও খারাপের দিকে নিয়ে যায়।
তাহলে পুরো আলোচনা থেকে শেষ পর্যন্ত কী দাঁড়ালো? একদিকে, তারেক রহমানের চরমপন্থা বিরোধী বক্তব্য নিঃসন্দেহে একটি নিখুঁত রাজনৈতিক কৌশল। এর মাধ্যমে তিনি দলের ইমেজ ফেরাতে চাইছেন, আন্তর্জাতিক সমর্থন চাইছেন এবং নারী ভোটারসহ একটি বড় অংশের মানুষের কাছে পৌঁছাতে চাইছেন।
কিন্তু অন্যদিকে, তার এই ভয়টা একেবারেই ভিত্তিহীন নয়। দেশের বর্তমান পরিস্থিতি, দুর্বল গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা আর রাজনৈতিক শূন্যতার সুযোগে উগ্রবাদী শক্তির মাথাচাড়া দেওয়ার একটা বাস্তব ঝুঁকি সত্যিই আছে। বিভিন্ন ঘটনা আর বিশ্লেষকদের কথাতেও সেই ইঙ্গিতই মিলছে।
তাহলে, তারেক রহমানের এই বক্তব্য কি দেশের জন্য একটি সত্যিকারের সতর্কবার্তা, নাকি স্রেফ রাজনৈতিক ফায়দা তোলার একটি নতুন কৌশল? সম্ভবত, উত্তরটা হলো—দুটোই। রাজনীতিতে প্রায়ই বাস্তব সংকট আর রাজনৈতিক কৌশল এভাবেই হাত ধরাধরি করে চলে। একজন বুদ্ধিমান রাজনীতিবিদ তো বাস্তব সংকটকেই কাজে লাগিয়ে নিজের রাজনৈতিক জমি শক্ত করেন।
চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আপনার। এই জটিল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে, তারেক রহমানের বক্তব্যকে আপনি কীভাবে দেখছেন? এটি কি বাংলাদেশের জন্য বিপদের কোনো পূর্বাভাস, নাকি ক্ষমতার খেলারই একটি নতুন চাল?
চেয়ারম্যান ও সম্পাদকঃ সামসুল আলমবার্তা সম্পাদকঃ মোঃ আসআদ
কপিরাইট © ২০২৫ ডি এস কে টিভি চ্যানেল
আপনার মতামত লিখুন