বাংলাদেশে টিকা কার্যক্রমের সাফল্য, বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ এবং করনীয় সমূহ।
প্রকাশের তারিখ : ২৮ আগস্ট ২০২৫
Health & Wellbeing for All
অদ্য ২৮ আগস্ট, ২০২৫, বৃহস্পতিবার সকাল ১০.৩০ ঘটিকায় জাতীয় প্রেসক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলরুমে স্বাস্থ্য সুরক্ষা ফাউন্ডেশনের আয়োজনে "বাংলাদেশে টিকা কার্যক্রমের সাফল্য, বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ এবং করণীয়" শীর্ষক একটি প্রেস কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হয়। স্বাস্থ্য সুরক্ষা ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে এবং 'ইউনিসেফ বাংলাদেশ ও স্বাস্থ্য সুরক্ষা ফাউন্ডেশন'-এর যৌথ অ্যাডভোকেসি প্রোজেক্ট এর আওতায় সরকারের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচী (EPI) এর সহায়তায় দেশের বিভিন্ন জেলায় টিকাদান কার্যক্রমের বর্তমান অবস্থা, প্রতিবন্ধকতা এবং করণীয় বিষয়ে এই প্রোগ্রাম আয়োজন করা হয়।
বাংলাদেশে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (EPI) দেশের জনস্বাস্থ্যে এক বৈশ্বিক সাফল্য হিসেবে স্বীকৃত। এই জীবনরক্ষাকারী টিকাদানের মাধ্যমে মা ও শিশুস্বাস্থ্যের ব্যাপক উন্নয়ন সাধন হয়েছে এবং মা ও শিশু মৃত্যুহার কমেছে এবং দেশের প্রতিটি অঞ্চলে টিকাদানের মাধ্যমে প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে। টিকাদান কর্মসূচীর মাধ্যমে ৫ বছরের নিচে শিশু মৃত্যুহার ৮১.৫% হ্রাস করা সম্ভব হয়েছে, যা শুধুমাত্র বাংলাদেশ, নেপাল, রুয়ান্ডা, ভিয়েতনাম, ইথিওপিয়া ও মালাউই-মোট ছয়টি দেশেই অর্জিত হয়েছে। গত দুই দশকে ৫ কোটিরও বেশি শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে, যা প্রতি বছর প্রায় ৯৪,০০০ শিশুর মৃত্যু প্রতিরোধে সক্ষম হয়েছে। টিকায় বিনিয়োগকৃত প্রতি ১ ডলারে ২৫.৪ ডলার রিটার্ন আসে, যা প্রমাণ করে টিকা স্বাস্থ্য ও উন্নয়নের অন্যতম সেরা বিনিয়োগ (সূত্র স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়/ইউনিসেফ টিকাদান বিনিয়োগ কেস ২০২৩)। বাংলাদেশ পোলিও নির্মূল, মাতৃ ও নবজাতক ধনুষ্টঙ্কার (MNT) নির্মূল এবং হেপাটাইটিস নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়েছে। কিশোরী মেয়েদের মধ্যে ৯৩% HPV টিকা কভারেজ অর্জিত হয়েছে, যা মহিলাদের সার্ভিকাল ক্যান্সার প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ইপিআই-তে ইউনিসেফ-এর টেকনিকাল সাপোর্টে ডিজিটাল উদ্ভাবন যেমন VaxEPI, ই-ট্র্যাকার, জিআইএস-ভিত্তিক অনলাইন মাইক্রোপ্লানিং এবং ই-ভিএলএমআইএস চালু করা হয়েছে। ইউনিসেফের সহায়তায় ইপিআই কর্মসূচির আওতায় ৬১টি জেলায় এবং ইপিআই সদর দপ্তরে মোট ১২০টি উদ্ভাবনী ওয়াক-ইন কুলার রুম প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। বাংলাদেশ সরকার আগামী ১২ অক্টোবর ২০২৫ সাল থেকে টাইফয়েড জ্বর প্রতিরোধে নতুন টিকা টিসিভি ক্যাম্পেইন চালু করতে যাচ্ছে এবং ২০২৬ সালে আরও নতুন টিকা ইপিআই কর্মসূচির আওতায় যুক্ত হবে।
তবে ইপিআই কার্যক্রম বাস্তবায়নে কিছু চ্যালেঞ্জ এখনও বিদ্যমান। টিকাদান প্রকল্পে বরাদ্দকৃত জনবলের প্রায় ৪০% পদ এখনও শূন্য, যার মধ্যে HA, AHI, HI, EPI টেকনিশিয়ান/পর্যবেক্ষকসহ ইপিআই সদর দপ্তরের শূন্যপদ ৪৩%। ৪৫ জেলায় টিকাদান কর্মী নিয়োগ এখনও সম্পন্ন হয়নি। জেলা পর্যায়ের কোল্ড চেইন টেকনিশিয়ানের ৫৩% পদ শূন্য রয়েছে। বাজেট বরাদ্দে দেরি এবং ৫ম HPNSP বাতিল এবং তার পরিবর্তে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (DPP) তৈরি করা হয়েছে যা এখনও অনুমোদিত হয়নি, এর ফলে টিকা ক্রয়, টিকা পরিবহণ এবং বণ্টনে বাধা সৃষ্টি হচ্ছে। যদি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS)/স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় (MOHFW) সেপ্টেম্বরের শুরুর মধ্যে টিকা ক্রয়ের অর্থ ছাড়ে বিলম্ব করে, তবে ২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে কিছু টিকার মজুদ ফুরিয়ে যাবে। এছাড়া ভৌগোলিক অবস্থার ভিত্তিতে টিকাদান কেন্দ্র এবং কর্মীদের সুষ্ঠু বণ্টন নেই। দুর্গম ও উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় পর্যাপ্ত টিকাদান কেন্দ্র ও কর্মী নেই, সিটি কর্পোরেশন ও পৌরসভায় কার্যকর টিকাদান কৌশল এবং পর্যাপ্ত জনবল না থাকায় কার্যক্রমে ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। এছাড়া জনসংখ্যা নির্ভুলভাবে নির্ধারণ না হওয়ায় টিকাদানের লক্ষ্য নির্ধারণে অসামঞ্জস্যতা এবং টিকা বরাদ্দে সমস্যা দেখা দিচ্ছে। পর্যবেক্ষণ ও প্রত্যক্ষ তদারকির অভাবের কারণে টিকার অপচয়, টিকা না পাওয়া শিশু এবং ঝরে পড়া শিশুর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। গ্রামাঞ্চলে টিকাদানকারী ও জনগণের মধ্যে আন্তব্যক্তিক যোগাযোগ (IPC) সীমিত, এবং শহরাঞ্চলেও এটি অনুপস্থিত। টাইফয়েড জ্বর প্রতিরোধে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে ইপিআই সম্পূর্ণ বিনামুল্যে ৯ মাস থেকে ১৫ বছরের কম বয়সী সকল শিশুদের জন্যে "টাইফয়েড টিকাদান ক্যাম্পেইন-২০২৫" আওতায় টিসিভি টিকা দেওয়ার ব্যবস্থা করেছে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মাদ্রাসা, ইংরেজি মাধ্যম স্কুলসহ অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অধ্যয়নরত সকল ছাত্র-ছাত্রী (প্লে/নার্সারি, কিন্ডারগার্টেন থেকে ৯ম শ্রেণী/সমমান শ্রেণী) এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বহির্ভূত কমিউনিটির ৯ মাস-১৫ বছরের কম বয়সী প্রায় ৫ কোটি শিশুকে এই টিকা প্রদান করা হবে। টিকা প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে ১৭ ডিজিটের জন্ম নিবন্ধন নাম্বার দিয়ে নিচের লিংকে প্রদত্ত ফর্মে নিবন্ধন করতে হবে। লিংকঃ https://vaxepi.gov.bd/registration/tcv
জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় টিকাদান কর্মসূচিকে আরও শক্তিশালী করতে সরকারকে অবিলম্বে শূন্যপদে নিয়োগ সম্পন্ন, সিটি কর্পোরেশনে নিজস্ব টিকাদান কর্মী নিয়োগ, বাজেট বরাদ্দ এবং রিলিজ দ্রুত সেপ্টেম্বরের ২০২৫-এর মধ্যে নিশ্চিত করা, ভ্যাকসিন সরবরাহ ও সরকারি বাজেটে কোল্ড চেইন রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা (এখন ইউনিসেফের সহায়তায়), বিশেষভাবে তৈরি জনসচেতনতা বৃদ্ধির প্রচারণা চালানো এবং দুর্গম এলাকায় বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরী।
জরুরী। ইপিআই/এমআইএস/ডিজিএসকে ইউনিসেফের সহায়তায় পরিচালিত সমস্ত ডিজিটাল উদ্ভাবন যেমন ই-ট্র্যাকার, ভ্যারাইপিআই, ইভিএলএমআইএস এবং জিআইএসভিত্তিক অনলাইন মাইক্রো প্ল্যান সম্প্রসারণ ও স্থায়ীকরণের জন্য বাজেট বরাদ্দ করতে হবে। পাশাপাশি নিয়মিত প্রশিক্ষণ, পর্যবেক্ষণ ও মনিটরিং নিশ্চিত করা EPI কর্মসূচিকে আরও কার্যকর ও স্থায়ী করবে। বাংলাদেশের টিকাদান কর্মসূচি আন্তর্জাতিক মানের উদাহরণ হয়ে বিশ্বকে দেখাচ্ছে যে, সুশৃঙ্খল পরিকল্পনা, যথাযথ অর্থায়ন এবং কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে শিশুর জীবন রক্ষা এবং স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়ন করা সম্ভব।
সংবাদ সম্মেলনে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন উক্ত গবেষণা সমূহের পরিচালক এবং স্বাস্থ্য সুরক্ষা ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক ডাঃ নিজাম উদ্দিন আহমেদ। তিনি বাংলাদেশের টিকাদান কর্মসূচির বর্তমান প্রতিবন্ধকতা এবং উত্তরণের উপায়সমূহ নিয়ে উক্ত আলোচনা করেন।
চেয়ারম্যান ও সম্পাদকঃ সামসুল আলমবার্তা সম্পাদকঃ মোঃ আসআদ
কপিরাইট © ২০২৫ ডি এস কে টিভি চ্যানেল
আপনার মতামত লিখুন