মাথায় বাঁশ-বেতের তৈরি মাতোল, গায়ে পোশাক বলতে শুধু লুঙ্গি। প্রখর রোদে পুড়ছে পিঠ বাঁ হাতে দড়ির খুটো শক্ত করে ধরা। ডান হাতে ভ্যাট গাছের সবুজ কচিডাল দিয়ে গরুর গা থেকে মশা-মাছি তাড়াচ্ছেন। আশ্বিনের দুপুরের রোদে চারপাশ যখন তপ্ত, তখনও কালো রঙের গরু দুটির পাশে হাঁটছেন ৭০ বছর বয়সী হাসেন আলী।
বগুড়ার মোকামতলা থেকে দেউলি ইউনিয়নে যাওয়ার সময় পথিমধ্যে হঠাৎ চোখ আটকালো একটি দৃশ্যে। গ্রামীণ সড়কের দুই পাশে আমন ধানের সবুজ বিস্তার। মেঠোপথ ধরে চলছিলেন হাসেন আলী ও তাঁর সঙ্গে থাকা শংকর জাতের কালো দুটি গরু।সেখানেই দেখা মেলে এই ৭০ বছর বয়সী হাসেন আলী খানের। বংশপরিচয়ে তিনি খান বংশের মো. আসহক আলী খানের ছেলে।
রহবলে ইউনিয়নের মেঘাখদ্দর গ্রামে থাকেন তিনি। দুই ছেলে ও এক মেয়ের বিয়ে হয়েছে আগেই। এখন সবার আলাদা সংসার হয়েছে। পরিবারের সহযোগিতা সীমিত হওয়ায় স্ত্রী ফাতেমাকে নিয়ে বৃদ্ধ হাসেনের আলাদা সংসার।
হাসেন আলী বলেন, জীবন বাঁচাতে সব করা লাগবি, কে দেখপি বুড়া-বুড়িক? বয়স ৭০ হবি, কিন্তু আল্লাহ গায়ে যেটুক বল-শক্তি রেখেছেন, তা দিয়ে গরু পালন ও অন্যের জমিতে কৃষিকাজ করি। সকালে বের হয় মাঠে আর বেলা গড়ালে ফিরি বাড়িতে। গরু পেট ভরে ঘাস খায় তা দেখেও মন জুড়ায়, ভালো লাগে তখন।
শক্তিতে কুলায় না, তাই বিভিন্ন ইশারা ও শব্দে গরুগুলোকে আয়ত্তে রেখে চরাচ্ছেন বৃদ্ধ হাসেন। প্রাণীগুলোও যেন ভাষা বুঝে শান্ত হয়ে ঘাস খাচ্ছে। কোনো ফসল নষ্ট করছে না। গরু পাথারে চড়ালে গুড়ো,পল কিনতে কম হয়।
বর্তমানে তাঁর গোয়ালে রয়েছে চারটি গরু। এর মধ্যে একটি দুধেল, একটি গাভিন এবং অন্য দুটি বাছুর ও ধামড়া। দুধেল গরুটি থেকে প্রতিদিন প্রায় পাঁচ সের দুধ দোহন করে দৈনিক বিক্রি করে আয় প্রায় ৩০০ টাকা। এই সামান্য আয় দিয়েই টেনেটুনে চলছে ৭০ বছর বয়সী হাসেন আলীর সংসার।
সংসারের বিভিন্ন প্রয়োজনের পাশাপাশি মেয়ের বিয়ের সমস্থ আয়োজনে গরু বিক্রির টাকা কাজে লাগান তিনি। অর্থনৈতিক ভাবে আত্মনির্ভরশীল হয়েছে গরু পালনে। কারোর কাছে হাত পাততে হয়না হাসেন আলীর আর।
প্রবীণ বয়সে মানুষের দেহ ক্লান্ত-শ্রান্ত হয়ে বিশ্রামের খোঁজ করার কথা। নয়তো পরিবার, আত্মীয়স্বজন, নাতি-নাতনির সঙ্গে সময় কাটানোর কথা। কিন্তু ৭০ বছর বয়সেও হাসেন আলীর সকাল শুরু হয় সংগ্রাম দিয়ে। গরুগুলোকে ধানের পল দেওয়া, গুঁড়ো, ভাত, পানি ও লবণ দিয়ে তৈরি শোততা দেওয়া, প্রতিদিন মাঠে নিয়ে তাজা ঘাস খাওয়ানো সবই নিজের হাতে করেন তিনি। ৬০ বছর বয়সী স্ত্রী ফাতেমা বিবির শরীরও নুয়ে পড়েছে। কষ্টসাধ্য হলেও করতে হয় সব কাজ তাঁদেরই।
এ সমাজে এখন বৃদ্ধ বাবা-মায়ের কদর কজন করে? বউ-বাচ্চা নিয়ে ভালো-মন্দ খেলেও বৃদ্ধ বাবা-মা পান না, কেউ তো রেখে আসে বৃদ্ধাশ্রমে। বয়স বাড়লে শরীর নুয়ে অচল হয় তখন জীবিকার জন্য অন্যের দুয়ারে হাত পাতেন কেউ কেউ। তাই হাসেন আলী এই বয়সেও গরু পালন করে জীবিকা পূরণ করছেন। তাঁর মতো অসংখ্য বৃদ্ধ দুবেলা খাওয়ার জন্য মাঠেঘাটে কত পেশায় যে কাজ করছেন, তা স্বচক্ষে দেখলেও হৃদয় দিয়ে অনুভব করা কঠিন।
বয়স বাড়ছে, কমছে শরীরে বল, সকাল হলেই গরুর দড়ির খুটো হাতে একই সঙ্গী নিয়ে মাঠে দেখা যায় হাসেন আলীকে। পরদিন সকালে একই রুটিন চলে। হয়তো বয়সের ভারে থেমে যাবে এই সংগ্রামী পথচলা, কিন্তু নীরব দুপুরে গরুর সঙ্গে পথচলার দীর্ঘ জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে যাবে স্মৃতির পাতায়।

রোববার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৭ অক্টোবর ২০২৬
মাথায় বাঁশ-বেতের তৈরি মাতোল, গায়ে পোশাক বলতে শুধু লুঙ্গি। প্রখর রোদে পুড়ছে পিঠ বাঁ হাতে দড়ির খুটো শক্ত করে ধরা। ডান হাতে ভ্যাট গাছের সবুজ কচিডাল দিয়ে গরুর গা থেকে মশা-মাছি তাড়াচ্ছেন। আশ্বিনের দুপুরের রোদে চারপাশ যখন তপ্ত, তখনও কালো রঙের গরু দুটির পাশে হাঁটছেন ৭০ বছর বয়সী হাসেন আলী।
বগুড়ার মোকামতলা থেকে দেউলি ইউনিয়নে যাওয়ার সময় পথিমধ্যে হঠাৎ চোখ আটকালো একটি দৃশ্যে। গ্রামীণ সড়কের দুই পাশে আমন ধানের সবুজ বিস্তার। মেঠোপথ ধরে চলছিলেন হাসেন আলী ও তাঁর সঙ্গে থাকা শংকর জাতের কালো দুটি গরু।সেখানেই দেখা মেলে এই ৭০ বছর বয়সী হাসেন আলী খানের। বংশপরিচয়ে তিনি খান বংশের মো. আসহক আলী খানের ছেলে।
রহবলে ইউনিয়নের মেঘাখদ্দর গ্রামে থাকেন তিনি। দুই ছেলে ও এক মেয়ের বিয়ে হয়েছে আগেই। এখন সবার আলাদা সংসার হয়েছে। পরিবারের সহযোগিতা সীমিত হওয়ায় স্ত্রী ফাতেমাকে নিয়ে বৃদ্ধ হাসেনের আলাদা সংসার।
হাসেন আলী বলেন, জীবন বাঁচাতে সব করা লাগবি, কে দেখপি বুড়া-বুড়িক? বয়স ৭০ হবি, কিন্তু আল্লাহ গায়ে যেটুক বল-শক্তি রেখেছেন, তা দিয়ে গরু পালন ও অন্যের জমিতে কৃষিকাজ করি। সকালে বের হয় মাঠে আর বেলা গড়ালে ফিরি বাড়িতে। গরু পেট ভরে ঘাস খায় তা দেখেও মন জুড়ায়, ভালো লাগে তখন।
শক্তিতে কুলায় না, তাই বিভিন্ন ইশারা ও শব্দে গরুগুলোকে আয়ত্তে রেখে চরাচ্ছেন বৃদ্ধ হাসেন। প্রাণীগুলোও যেন ভাষা বুঝে শান্ত হয়ে ঘাস খাচ্ছে। কোনো ফসল নষ্ট করছে না। গরু পাথারে চড়ালে গুড়ো,পল কিনতে কম হয়।
বর্তমানে তাঁর গোয়ালে রয়েছে চারটি গরু। এর মধ্যে একটি দুধেল, একটি গাভিন এবং অন্য দুটি বাছুর ও ধামড়া। দুধেল গরুটি থেকে প্রতিদিন প্রায় পাঁচ সের দুধ দোহন করে দৈনিক বিক্রি করে আয় প্রায় ৩০০ টাকা। এই সামান্য আয় দিয়েই টেনেটুনে চলছে ৭০ বছর বয়সী হাসেন আলীর সংসার।
সংসারের বিভিন্ন প্রয়োজনের পাশাপাশি মেয়ের বিয়ের সমস্থ আয়োজনে গরু বিক্রির টাকা কাজে লাগান তিনি। অর্থনৈতিক ভাবে আত্মনির্ভরশীল হয়েছে গরু পালনে। কারোর কাছে হাত পাততে হয়না হাসেন আলীর আর।
প্রবীণ বয়সে মানুষের দেহ ক্লান্ত-শ্রান্ত হয়ে বিশ্রামের খোঁজ করার কথা। নয়তো পরিবার, আত্মীয়স্বজন, নাতি-নাতনির সঙ্গে সময় কাটানোর কথা। কিন্তু ৭০ বছর বয়সেও হাসেন আলীর সকাল শুরু হয় সংগ্রাম দিয়ে। গরুগুলোকে ধানের পল দেওয়া, গুঁড়ো, ভাত, পানি ও লবণ দিয়ে তৈরি শোততা দেওয়া, প্রতিদিন মাঠে নিয়ে তাজা ঘাস খাওয়ানো সবই নিজের হাতে করেন তিনি। ৬০ বছর বয়সী স্ত্রী ফাতেমা বিবির শরীরও নুয়ে পড়েছে। কষ্টসাধ্য হলেও করতে হয় সব কাজ তাঁদেরই।
এ সমাজে এখন বৃদ্ধ বাবা-মায়ের কদর কজন করে? বউ-বাচ্চা নিয়ে ভালো-মন্দ খেলেও বৃদ্ধ বাবা-মা পান না, কেউ তো রেখে আসে বৃদ্ধাশ্রমে। বয়স বাড়লে শরীর নুয়ে অচল হয় তখন জীবিকার জন্য অন্যের দুয়ারে হাত পাতেন কেউ কেউ। তাই হাসেন আলী এই বয়সেও গরু পালন করে জীবিকা পূরণ করছেন। তাঁর মতো অসংখ্য বৃদ্ধ দুবেলা খাওয়ার জন্য মাঠেঘাটে কত পেশায় যে কাজ করছেন, তা স্বচক্ষে দেখলেও হৃদয় দিয়ে অনুভব করা কঠিন।
বয়স বাড়ছে, কমছে শরীরে বল, সকাল হলেই গরুর দড়ির খুটো হাতে একই সঙ্গী নিয়ে মাঠে দেখা যায় হাসেন আলীকে। পরদিন সকালে একই রুটিন চলে। হয়তো বয়সের ভারে থেমে যাবে এই সংগ্রামী পথচলা, কিন্তু নীরব দুপুরে গরুর সঙ্গে পথচলার দীর্ঘ জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে যাবে স্মৃতির পাতায়।

আপনার মতামত লিখুন