ডি এস কে টিভি চ্যানেল
প্রকাশ : রোববার, ২১ জুন ২০২৬

স্রোতের বিপরীতে যাঁরা সাঁতার কাটেন, তাঁরাই আসলে ভবিষ্যতের সংকটের রক্ষা কবচ।

স্রোতের বিপরীতে সাঁতারু: বিদ্রোহী নন, অভিভাবক

স্রোতের বিপরীতে সাঁতারু: বিদ্রোহী নন, অভিভাবক

স্রোতের বিপরীতে সাঁতারু: বিদ্রোহী নন, অভিভাবক

বর্তমানে কর্পোরেট জগতে ‘অ্যাডজাস্টেবল’ হওয়ার মাহাত্ম্য এতটাই বেড়ে গেছে যে, ‘অ্যাডজাস্ট না করে সরাসরি সত্য বলা’ যেন অপরাধের মতো শোনায়। অধিকাংশ সংস্থাতেই এখন ‘কালচার ফিট’ বলতে বোঝানো হয়— আপনার উর্ধ্বতন যা বলেন, তাই মেনে নেওয়া। প্রশ্ন করার অধিকার নেই, নীতি নিয়ে তর্ক নেই, আছে শুধু হ্যাঁ-সরে নির্দেশ পালন। কিন্তু এই যে ‘গুড বয়ের’ সুবর্ণ সময় চলছে, এতে কিন্তু কোম্পানির ভিত নীরবে দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। কারণ একটি মাত্র বাস্তবতা বারবার প্রমাণিত হয়েছে— সবচেয়ে বড় ক্ষতি কোম্পানির হয় তখনই, যখন চার দেওয়ালের মধ্যে খারাপ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে বলার মতো সাহসী মানুষ আর থাকেন না। আর সেই মানুষদেরই আজ ‘প্রবলেম ক্রিয়েটর’ বা ‘টক্সিক’ লেবেল দেওয়া হয়। অথচ সত্যি কথা বলতে কী, স্রোতের বিপরীতে যাঁরা সাঁতার কাটেন, তাঁরাই আসলে ভবিষ্যতের সংকটের রক্ষা কবচ।

প্রশ্ন হলো— কোম্পানির অধিকাংশ ভুল সংস্কৃতি কী কর্ণধার জানেন? 

অধিকাংশ সময়ই উত্তর ‘না’।

কারণ চক্রটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম। মালিক পক্ষ কিংবা বোর্ড অনেক সময় সরব দৃষ্টি রাখেন অপারেশনের ওপরে, কিন্তু অন্তঃসত্ত্বা সংস্কৃতির ওপরে নয়। ঠিক এই ফাঁকটাই কাজে লাগান ‘প্রথম স্তরের লিডারশিপ’। প্রথম সারিতে বসা অভিজ্ঞ কর্তারা নিজেদের আসন অটুট রাখতে গড়ে তোলেন এক বিশেষ নিরাপত্তা বলয়। এই বলয়ের অন্যতম হাতিয়ার হলো ‘বুটলিকার সংস্কৃতি’। যেখানে কাজের দক্ষতা নয়, বরং চাটুকারিতাই পদোন্নতির পথ। সেখানে বাছাই করা হয় সেই সব কর্মীকে, যারা প্রশ্ন করে না, নীরবে ভুল সমর্থন করে, এমনকি ভুল পরিকল্পনার সুফল নিজের বলে উপস্থাপন করে উর্ধ্বতনকে খুশি রাখে। অথচ প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার ফলাফল দেখেন— দেখেন আপাত দৃষ্টিতে টিম ‘কর্মঠ’, লিডারশিপ ‘অ্যাফিশিয়েন্ট’। কিন্তু নিচের তলায় বাস্তবটা সম্পূর্ণ ভিন্ন। লিডারশিপের এই ‘প্রোক্সিমিটি পাওয়ার’ মালিকদের থেকে আসল তথ্য আড়াল করে দেয়। কারণ কেউ চায় না যে, মালিক জানুক— ‘আমাদের প্রকল্প ডুবছে শুধু এই কারণে, যে ভুল ডাটা ওপরের স্তরে পৌঁছচ্ছে।’ তথ্যের এই কারসাজি কোনো কালেই ভালো প্রতিষ্ঠান তৈরি করতে পারেনি, কিন্তু প্রতিটি প্রতিষ্ঠানেই এই কারসাজির একটা ‘টলারেন্স লেভেল’ থেকে যায়, যতক্ষণ না বড় ধ্বস নামে।

কিন্তু প্রতিটি প্রতিষ্ঠানেই প্রায়ই কিছু চরিত্র থাকেন— যাঁদেরকে ভিড়ের মধ্যে ‘অলীক’ বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। সংস্কৃতির এই গভীর জলের মাঝেই হঠাৎ দেখা যায় কয়েকজন মিডল-ম্যানেজার অথবা সিনিয়র লিডার যিনি/যারা থামিয়ে দেন হোঁচট খাওয়াকে। তিনি মিটিংয়ে কোমর বেঁধে উঠে দাঁড়ান। বলেন— “স্যার, আমাদের প্রসেসটা ভুল। আমরা রিয়েল ইস্যু এড়িয়ে যাচ্ছি। ডিপার্টমেন্টের বাজেট কাটছি, কিন্তু যেখানে আসলে বাজেট লিক হচ্ছে সেখানে নজর দিচ্ছি না। আমরা কিছু নৈতিক সীমা লংঘন করছি যা দীর্ঘমেয়াদে কোম্পানির নাম ডুবাবে। একই সঙ্গে তাঁর চারপাশের সহকর্মীরা বিস্ময় ও ভয়ের মিশ্র দৃষ্টিতে তাকান। তাঁরা ভাবেন— ‘এই বুঝি চাকরি গেল! আমাদেরও টান লাগাতে পারে।’

কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, এই ব্যক্তি/ব্যক্তিবর্গ ভবিষ্যৎ স্বীকৃতি পান না বরং ‘প্রবলেম’ হয়ে ওঠেন। তাঁর বিরুদ্ধে যায় ইমেইল, হয় ‘পারফরম্যান্স ইমপ্রুভমেন্ট প্ল্যানে’ (পিআইপি) ফেলা, কিংবা তাঁকে আইসোলেট করে দেওয়া হয়। অথচ তিনিই কোম্পানির প্রকৃত স্বার্থ দেখছিলেন, ব্যক্তিস্বার্থ নয়।

 ‘সুইমিং অ্যাগেইনস্ট দ্য টাইড’কেন বড় পণ?

স্রোতের বিপরীতে সাঁতার দেওয়া কোনো ভুল নয়— এটি আসলে একটি পণ। সাহসের, নীতিনিষ্ঠার আর আত্মমর্যাদার পণ। কর্পোরেট দুনিয়ায় যেখানে কর্মীদের বড় অংশ ক্যারিয়ার বাঁচাতে ‘রাজনীতি’তে মেতে ওঠে, সেখানে কেউ যদি নিজের চাকরির ঝুঁকি নিয়েও সত্য বলে— তা কেবলই অভিনন্দনের যোগ্য। মনোবিজ্ঞান বলে, ‘গ্রুপথিংক’-এর কবলে পড়ে অধিকাংশ সংস্থা খারাপ সিদ্ধান্ত নেয়। গ্রুপথিংকের একমাত্র প্রতিষেধক হলো সেই ব্যক্তি, যিনি ‘ডেভিলস অ্যাডভোকেট’ হওয়ার সাহস রাখেন। তিনি যতই তিরস্কৃত হোন, তাঁর কণ্ঠস্বরই একদিন প্রমাণ করে দেয়— আপাত ‘অশান্তি’ আসলে ছিল রক্ষাকবচ।

একটি উদাহরণ দেওয়া যাক। ২০০৮-এর বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার আগে বহু ব্যাংকে কয়েকজন অর্থনীতিবিদ জোর গলায় বলেছিলেন— ‘আমরা দুর্বল ঋণের ওপর ঝুঁকি বাড়াচ্ছি, এটা ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনবে।’ তাঁদের প্রায় সবাইকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল ‘আতঙ্ক ছড়ানোর’ অভিযোগে। পরে সেই বিপর্যয় যখন এল, সবাই বুঝল— ওই সরিয়ে দেওয়া লোকগুলোই আসলে ছিল প্রতিষ্ঠান বাঁচানোর শেষ বর্ম। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও বহু সংস্থার অন্দরমহলের গল্প জানা যায়। যেখানে পোশাক শিল্পের একটি কারখানায় নিরাপত্তা মান লঙ্ঘন নিয়ে কথা বলায় এক নির্বাহীকে বদলি করা হয়েছিল। পরে সেই কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটলে মালিক অনুতপ্ত হন— কেন তিনি স্রোতের বিপরীতে সাঁতার কাটা মানুষটিকে আগে গুরুত্ব দেননি।

‘হুইসেলব্লোয়ার’ কি কখনো প্রতিষ্ঠান রক্ষা করতে পারেন?

এককথায়— হ্যাঁ, তবে শর্ত সাপেক্ষে। যে কোম্পানি টেকসই হতে চায়, তার প্রথম কাজ হওয়া উচিত নীচের স্তর থেকে উঠে আসা ‘স্বচ্ছ’ বার্তাগুলোকে সম্মান দেওয়া। কোম্পানির উচিত অভ্যন্তরীণ পলিসি তৈরি করা, যেখানে ‘রিপোর্টিং মিসকন্ডাক্ট’ কে ‘কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট’ হিসেবে না দেখে ‘কনফ্লিক্ট রেজলিউশন’ হিসেবে দেখা হয়। বিদেশি বহু কর্পোরেশনে এখন ‘চিফ এথিক্স অফিসার’ থাকেন, যাঁর দরজা সবার জন্য খোলা, যিনি সরাসরি বোর্ডের কাছে রিপোর্ট করেন। সেখানে ‘হুইসেলব্লোয়ার প্রটেকশন’ আইনগত অধিকার। পশ্চিমা বিশ্বের এনরন ও ওয়ার্ল্ডকম কেলেঙ্কারির পর তারা শিখেছে— এই ‘বিদ্রোহী’ কর্মীরা কোম্পানির অ্যাসেট, লায়াবিলিটি নয়।

কিন্তু বর্তমান বাংলাদেশি কর্পোরেট সংস্কৃতি কোথায় দাঁড়িয়ে? এখানে এখনো অনেক প্রতিষ্ঠানে ‘স্পিক আপ’ করলে ‘আউটসাইডার’ হয়ে যাওয়ার ভয় থাকে। ‘বসকে চ্যালেঞ্জ করা’ এবং ‘ভুল প্রক্রিয়া চিহ্নিত করা’— এই দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য করতে পারেন না অনেকে। ফলে যারা ভালো করতে চান, তারা চুপ থাকতে শেখেন। আর চুপ থাকা মানেই মৃত সংস্কৃতি এবং প্রতিষ্ঠানের পতন। 

প্রতিষ্ঠানের কর্ণধারদের কী করণীয়?

প্রতিষ্ঠানের মূল চালিকাশক্তি মালিকপক্ষ বা বোর্ড। তারা চাইলে প্রথম স্তরের ‘পালিসি লুপফোল’ ভেদ করে সরাসরি সত্য শুনতে পারেন। তার জন্য দরকার—

১. ওপেন ডোর নীতি বাস্তবায়ন: নামেই নয়, কর্মে। কর্মী যাতে ভয় ছাড়া সরাসরি মালিক বা স্বতন্ত্র পরিচালকের কাছে অভিযোগ জানাতে পারেন, তার কাঠামো থাকতে হবে।

২. ‘রেড ফ্ল্যাগ’ মিটিং চালু করা: যেখানে অ্যাজেন্ডা ছাড়া কিছু কর্মী বসবেন, লিডারশিপ ছাড়া, শুধু ভুল সংশোধনের পরামর্শ দেবেন এবং প্রতিষ্ঠানে আসলে কি হচ্ছে তা জানাবে। 

৩. ‘হুইসেলব্লোয়ার প্রটেকশন পলিসি: সংবিধিবদ্ধভাবে ঘোষণা করতে হবে, সত্য বলার জন্য কাউকে শাস্তি দেওয়া হবে না, বরং পুরস্কৃত করা হবে। এ জন্য আলাদা পুরস্কার প্রবর্তন করতে পারেন কোম্পানি।

৪. বাইরের অডিট (কালচারাল অডিট): শুধু হিসাব নয়, সংস্কৃতিরও অডিট হওয়া উচিত। স্বাধীন উপদেষ্টা এসে কর্মীদের বেনামে মতামত নেবেন— কোম্পানির ‘ভীতির জায়গা’ কোথায়।

৫. লিডারশিপ রিভিউতে ৩৬০ ডিগ্রি ফিডব্যাক বাধ্যতামূলক করা: যেখানে কর্মীরা তাঁদের সরাসরি উর্ধ্বতনকে মূল্যায়ন করবেন। চাটুকারদের বনামে সত্যবাদীরা যেন চিহ্নিত হতে পারেন।

 ‘স্ট্যান্ডিং আউট’ যেন ‘আউটকাস্ট’ না হয়

কর্পোরেট দুনিয়া যত জটিল হবে, সত্য বলার দাম তত বেশি হবে। এটা সত্যি— কোনো প্রতিষ্ঠান চিরদিন ভুয়া প্রশংসার ভিত্তিতে দাঁড়াতে পারে না। দাঁড়ায় সত্যের ওপর। আর সেই সত্য কখনো কখনো আসে কয়েকজনের সাহসী কণ্ঠস্বর থেকে— যাঁরা ‘লাইন ক্রস’ করতে জানে অসত্যের বিরুদ্ধে, অনিয়মের বিরুদ্ধে, খারাপ কালচারকে রুখে দাঁড়াতে।

স্রোতের বিপরীতে সাঁতার কাটা সহজ কাজ নয়। এই সাঁতারুকে যদি সংস্থাই নিজের করে না নেয়, তবে ধীরে ধীরে সব সাঁতারুই তীরে উঠে চুপচাপ বসে থাকতে শিখবে। আর সেই নীরবতাই একদিন ভয়াবহ ধ্বস নামাবে। তাই আমরা বলতে চাই— যিনি আজ কোম্পানির ভুল ধরে দেন, যিনি প্রতিবাদ করেন, যিনি ‘চোখরাঙানি’কে পাত্তা না দিয়ে বাজে সংস্কৃতির বিরুদ্ধে দাঁড়ান, তিনিই আসলে কোম্পানির রক্ষক। তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ‘বিরুদ্ধ’ নয়, এটি সাহসের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। সব কর্পোরেট নেতার উচিত এই বার্তা দেওয়া— “আমাদের এখানে ভুল সংস্কৃতির বিপরীতে কণ্ঠস্বর তুলবেন যাঁরা, তাঁরা আমাদের ঘরের মানুষ, তাঁরা আমাদের অভিভাবক।” কারণ শেষ পর্যন্ত সত্যের জয় হয়, হয় তাঁর দ্বারাই যাঁরা মিথ্যার স্রোতে গা ভাসাননি, বরং উল্টো সাঁতরে কিনারায় পৌঁছেছেন। হুইসেল ব্লয়ার কর্মী যেন চাকরি হারানোর ভয়ে মুখ বুজে না থাকেন। একইসঙ্গে বলি, সংস্থার শীর্ষ কর্ণধারদের উচিত প্রতি মাসে অন্তত একদিন সেই ‘সাহসী কর্মীর’ সাথে বসে কথা বলা— যাঁর নাম টিম মিটিংয়ে ‘নেগেটিভ’ হিসেবে ওঠে। কারণ সে নেতিবাচক নয়, সে সম্ভবত আপনার কোম্পানির সবচেয়ে দামি পাথেয়। স্রোতের বিপরীতে যাঁরা দাঁড়ান, তাঁদের পিঠে চাপড় দিন— আগামীর টেকসই প্রতিষ্ঠান গড়তে এই চাপড়টাই বীজ বুনবে।

আপনার মতামত লিখুন

পরবর্তী খবর
ডি এস কে টিভি চ্যানেল

রোববার, ২১ জুন ২০২৬


স্রোতের বিপরীতে সাঁতারু: বিদ্রোহী নন, অভিভাবক

প্রকাশের তারিখ : ২১ জুন ২০২৬

featured Image

স্রোতের বিপরীতে সাঁতারু: বিদ্রোহী নন, অভিভাবক


বর্তমানে কর্পোরেট জগতে ‘অ্যাডজাস্টেবল’ হওয়ার মাহাত্ম্য এতটাই বেড়ে গেছে যে, ‘অ্যাডজাস্ট না করে সরাসরি সত্য বলা’ যেন অপরাধের মতো শোনায়। অধিকাংশ সংস্থাতেই এখন ‘কালচার ফিট’ বলতে বোঝানো হয়— আপনার উর্ধ্বতন যা বলেন, তাই মেনে নেওয়া। প্রশ্ন করার অধিকার নেই, নীতি নিয়ে তর্ক নেই, আছে শুধু হ্যাঁ-সরে নির্দেশ পালন। কিন্তু এই যে ‘গুড বয়ের’ সুবর্ণ সময় চলছে, এতে কিন্তু কোম্পানির ভিত নীরবে দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। কারণ একটি মাত্র বাস্তবতা বারবার প্রমাণিত হয়েছে— সবচেয়ে বড় ক্ষতি কোম্পানির হয় তখনই, যখন চার দেওয়ালের মধ্যে খারাপ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে বলার মতো সাহসী মানুষ আর থাকেন না। আর সেই মানুষদেরই আজ ‘প্রবলেম ক্রিয়েটর’ বা ‘টক্সিক’ লেবেল দেওয়া হয়। অথচ সত্যি কথা বলতে কী, স্রোতের বিপরীতে যাঁরা সাঁতার কাটেন, তাঁরাই আসলে ভবিষ্যতের সংকটের রক্ষা কবচ।


প্রশ্ন হলো— কোম্পানির অধিকাংশ ভুল সংস্কৃতি কী কর্ণধার জানেন? 


অধিকাংশ সময়ই উত্তর ‘না’।

কারণ চক্রটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম। মালিক পক্ষ কিংবা বোর্ড অনেক সময় সরব দৃষ্টি রাখেন অপারেশনের ওপরে, কিন্তু অন্তঃসত্ত্বা সংস্কৃতির ওপরে নয়। ঠিক এই ফাঁকটাই কাজে লাগান ‘প্রথম স্তরের লিডারশিপ’। প্রথম সারিতে বসা অভিজ্ঞ কর্তারা নিজেদের আসন অটুট রাখতে গড়ে তোলেন এক বিশেষ নিরাপত্তা বলয়। এই বলয়ের অন্যতম হাতিয়ার হলো ‘বুটলিকার সংস্কৃতি’। যেখানে কাজের দক্ষতা নয়, বরং চাটুকারিতাই পদোন্নতির পথ। সেখানে বাছাই করা হয় সেই সব কর্মীকে, যারা প্রশ্ন করে না, নীরবে ভুল সমর্থন করে, এমনকি ভুল পরিকল্পনার সুফল নিজের বলে উপস্থাপন করে উর্ধ্বতনকে খুশি রাখে। অথচ প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার ফলাফল দেখেন— দেখেন আপাত দৃষ্টিতে টিম ‘কর্মঠ’, লিডারশিপ ‘অ্যাফিশিয়েন্ট’। কিন্তু নিচের তলায় বাস্তবটা সম্পূর্ণ ভিন্ন। লিডারশিপের এই ‘প্রোক্সিমিটি পাওয়ার’ মালিকদের থেকে আসল তথ্য আড়াল করে দেয়। কারণ কেউ চায় না যে, মালিক জানুক— ‘আমাদের প্রকল্প ডুবছে শুধু এই কারণে, যে ভুল ডাটা ওপরের স্তরে পৌঁছচ্ছে।’ তথ্যের এই কারসাজি কোনো কালেই ভালো প্রতিষ্ঠান তৈরি করতে পারেনি, কিন্তু প্রতিটি প্রতিষ্ঠানেই এই কারসাজির একটা ‘টলারেন্স লেভেল’ থেকে যায়, যতক্ষণ না বড় ধ্বস নামে।


কিন্তু প্রতিটি প্রতিষ্ঠানেই প্রায়ই কিছু চরিত্র থাকেন— যাঁদেরকে ভিড়ের মধ্যে ‘অলীক’ বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। সংস্কৃতির এই গভীর জলের মাঝেই হঠাৎ দেখা যায় কয়েকজন মিডল-ম্যানেজার অথবা সিনিয়র লিডার যিনি/যারা থামিয়ে দেন হোঁচট খাওয়াকে। তিনি মিটিংয়ে কোমর বেঁধে উঠে দাঁড়ান। বলেন— “স্যার, আমাদের প্রসেসটা ভুল। আমরা রিয়েল ইস্যু এড়িয়ে যাচ্ছি। ডিপার্টমেন্টের বাজেট কাটছি, কিন্তু যেখানে আসলে বাজেট লিক হচ্ছে সেখানে নজর দিচ্ছি না। আমরা কিছু নৈতিক সীমা লংঘন করছি যা দীর্ঘমেয়াদে কোম্পানির নাম ডুবাবে। একই সঙ্গে তাঁর চারপাশের সহকর্মীরা বিস্ময় ও ভয়ের মিশ্র দৃষ্টিতে তাকান। তাঁরা ভাবেন— ‘এই বুঝি চাকরি গেল! আমাদেরও টান লাগাতে পারে।’


কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, এই ব্যক্তি/ব্যক্তিবর্গ ভবিষ্যৎ স্বীকৃতি পান না বরং ‘প্রবলেম’ হয়ে ওঠেন। তাঁর বিরুদ্ধে যায় ইমেইল, হয় ‘পারফরম্যান্স ইমপ্রুভমেন্ট প্ল্যানে’ (পিআইপি) ফেলা, কিংবা তাঁকে আইসোলেট করে দেওয়া হয়। অথচ তিনিই কোম্পানির প্রকৃত স্বার্থ দেখছিলেন, ব্যক্তিস্বার্থ নয়।

 ‘সুইমিং অ্যাগেইনস্ট দ্য টাইড’কেন বড় পণ?


স্রোতের বিপরীতে সাঁতার দেওয়া কোনো ভুল নয়— এটি আসলে একটি পণ। সাহসের, নীতিনিষ্ঠার আর আত্মমর্যাদার পণ। কর্পোরেট দুনিয়ায় যেখানে কর্মীদের বড় অংশ ক্যারিয়ার বাঁচাতে ‘রাজনীতি’তে মেতে ওঠে, সেখানে কেউ যদি নিজের চাকরির ঝুঁকি নিয়েও সত্য বলে— তা কেবলই অভিনন্দনের যোগ্য। মনোবিজ্ঞান বলে, ‘গ্রুপথিংক’-এর কবলে পড়ে অধিকাংশ সংস্থা খারাপ সিদ্ধান্ত নেয়। গ্রুপথিংকের একমাত্র প্রতিষেধক হলো সেই ব্যক্তি, যিনি ‘ডেভিলস অ্যাডভোকেট’ হওয়ার সাহস রাখেন। তিনি যতই তিরস্কৃত হোন, তাঁর কণ্ঠস্বরই একদিন প্রমাণ করে দেয়— আপাত ‘অশান্তি’ আসলে ছিল রক্ষাকবচ।


একটি উদাহরণ দেওয়া যাক। ২০০৮-এর বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার আগে বহু ব্যাংকে কয়েকজন অর্থনীতিবিদ জোর গলায় বলেছিলেন— ‘আমরা দুর্বল ঋণের ওপর ঝুঁকি বাড়াচ্ছি, এটা ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনবে।’ তাঁদের প্রায় সবাইকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল ‘আতঙ্ক ছড়ানোর’ অভিযোগে। পরে সেই বিপর্যয় যখন এল, সবাই বুঝল— ওই সরিয়ে দেওয়া লোকগুলোই আসলে ছিল প্রতিষ্ঠান বাঁচানোর শেষ বর্ম। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও বহু সংস্থার অন্দরমহলের গল্প জানা যায়। যেখানে পোশাক শিল্পের একটি কারখানায় নিরাপত্তা মান লঙ্ঘন নিয়ে কথা বলায় এক নির্বাহীকে বদলি করা হয়েছিল। পরে সেই কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটলে মালিক অনুতপ্ত হন— কেন তিনি স্রোতের বিপরীতে সাঁতার কাটা মানুষটিকে আগে গুরুত্ব দেননি।


‘হুইসেলব্লোয়ার’ কি কখনো প্রতিষ্ঠান রক্ষা করতে পারেন?


এককথায়— হ্যাঁ, তবে শর্ত সাপেক্ষে। যে কোম্পানি টেকসই হতে চায়, তার প্রথম কাজ হওয়া উচিত নীচের স্তর থেকে উঠে আসা ‘স্বচ্ছ’ বার্তাগুলোকে সম্মান দেওয়া। কোম্পানির উচিত অভ্যন্তরীণ পলিসি তৈরি করা, যেখানে ‘রিপোর্টিং মিসকন্ডাক্ট’ কে ‘কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট’ হিসেবে না দেখে ‘কনফ্লিক্ট রেজলিউশন’ হিসেবে দেখা হয়। বিদেশি বহু কর্পোরেশনে এখন ‘চিফ এথিক্স অফিসার’ থাকেন, যাঁর দরজা সবার জন্য খোলা, যিনি সরাসরি বোর্ডের কাছে রিপোর্ট করেন। সেখানে ‘হুইসেলব্লোয়ার প্রটেকশন’ আইনগত অধিকার। পশ্চিমা বিশ্বের এনরন ও ওয়ার্ল্ডকম কেলেঙ্কারির পর তারা শিখেছে— এই ‘বিদ্রোহী’ কর্মীরা কোম্পানির অ্যাসেট, লায়াবিলিটি নয়।


কিন্তু বর্তমান বাংলাদেশি কর্পোরেট সংস্কৃতি কোথায় দাঁড়িয়ে? এখানে এখনো অনেক প্রতিষ্ঠানে ‘স্পিক আপ’ করলে ‘আউটসাইডার’ হয়ে যাওয়ার ভয় থাকে। ‘বসকে চ্যালেঞ্জ করা’ এবং ‘ভুল প্রক্রিয়া চিহ্নিত করা’— এই দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য করতে পারেন না অনেকে। ফলে যারা ভালো করতে চান, তারা চুপ থাকতে শেখেন। আর চুপ থাকা মানেই মৃত সংস্কৃতি এবং প্রতিষ্ঠানের পতন। 

প্রতিষ্ঠানের কর্ণধারদের কী করণীয়?


প্রতিষ্ঠানের মূল চালিকাশক্তি মালিকপক্ষ বা বোর্ড। তারা চাইলে প্রথম স্তরের ‘পালিসি লুপফোল’ ভেদ করে সরাসরি সত্য শুনতে পারেন। তার জন্য দরকার—


১. ওপেন ডোর নীতি বাস্তবায়ন: নামেই নয়, কর্মে। কর্মী যাতে ভয় ছাড়া সরাসরি মালিক বা স্বতন্ত্র পরিচালকের কাছে অভিযোগ জানাতে পারেন, তার কাঠামো থাকতে হবে।


২. ‘রেড ফ্ল্যাগ’ মিটিং চালু করা: যেখানে অ্যাজেন্ডা ছাড়া কিছু কর্মী বসবেন, লিডারশিপ ছাড়া, শুধু ভুল সংশোধনের পরামর্শ দেবেন এবং প্রতিষ্ঠানে আসলে কি হচ্ছে তা জানাবে। 


৩. ‘হুইসেলব্লোয়ার প্রটেকশন পলিসি: সংবিধিবদ্ধভাবে ঘোষণা করতে হবে, সত্য বলার জন্য কাউকে শাস্তি দেওয়া হবে না, বরং পুরস্কৃত করা হবে। এ জন্য আলাদা পুরস্কার প্রবর্তন করতে পারেন কোম্পানি।


৪. বাইরের অডিট (কালচারাল অডিট): শুধু হিসাব নয়, সংস্কৃতিরও অডিট হওয়া উচিত। স্বাধীন উপদেষ্টা এসে কর্মীদের বেনামে মতামত নেবেন— কোম্পানির ‘ভীতির জায়গা’ কোথায়।


৫. লিডারশিপ রিভিউতে ৩৬০ ডিগ্রি ফিডব্যাক বাধ্যতামূলক করা: যেখানে কর্মীরা তাঁদের সরাসরি উর্ধ্বতনকে মূল্যায়ন করবেন। চাটুকারদের বনামে সত্যবাদীরা যেন চিহ্নিত হতে পারেন।


 ‘স্ট্যান্ডিং আউট’ যেন ‘আউটকাস্ট’ না হয়

কর্পোরেট দুনিয়া যত জটিল হবে, সত্য বলার দাম তত বেশি হবে। এটা সত্যি— কোনো প্রতিষ্ঠান চিরদিন ভুয়া প্রশংসার ভিত্তিতে দাঁড়াতে পারে না। দাঁড়ায় সত্যের ওপর। আর সেই সত্য কখনো কখনো আসে কয়েকজনের সাহসী কণ্ঠস্বর থেকে— যাঁরা ‘লাইন ক্রস’ করতে জানে অসত্যের বিরুদ্ধে, অনিয়মের বিরুদ্ধে, খারাপ কালচারকে রুখে দাঁড়াতে।


স্রোতের বিপরীতে সাঁতার কাটা সহজ কাজ নয়। এই সাঁতারুকে যদি সংস্থাই নিজের করে না নেয়, তবে ধীরে ধীরে সব সাঁতারুই তীরে উঠে চুপচাপ বসে থাকতে শিখবে। আর সেই নীরবতাই একদিন ভয়াবহ ধ্বস নামাবে। তাই আমরা বলতে চাই— যিনি আজ কোম্পানির ভুল ধরে দেন, যিনি প্রতিবাদ করেন, যিনি ‘চোখরাঙানি’কে পাত্তা না দিয়ে বাজে সংস্কৃতির বিরুদ্ধে দাঁড়ান, তিনিই আসলে কোম্পানির রক্ষক। তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ‘বিরুদ্ধ’ নয়, এটি সাহসের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। সব কর্পোরেট নেতার উচিত এই বার্তা দেওয়া— “আমাদের এখানে ভুল সংস্কৃতির বিপরীতে কণ্ঠস্বর তুলবেন যাঁরা, তাঁরা আমাদের ঘরের মানুষ, তাঁরা আমাদের অভিভাবক।” কারণ শেষ পর্যন্ত সত্যের জয় হয়, হয় তাঁর দ্বারাই যাঁরা মিথ্যার স্রোতে গা ভাসাননি, বরং উল্টো সাঁতরে কিনারায় পৌঁছেছেন। হুইসেল ব্লয়ার কর্মী যেন চাকরি হারানোর ভয়ে মুখ বুজে না থাকেন। একইসঙ্গে বলি, সংস্থার শীর্ষ কর্ণধারদের উচিত প্রতি মাসে অন্তত একদিন সেই ‘সাহসী কর্মীর’ সাথে বসে কথা বলা— যাঁর নাম টিম মিটিংয়ে ‘নেগেটিভ’ হিসেবে ওঠে। কারণ সে নেতিবাচক নয়, সে সম্ভবত আপনার কোম্পানির সবচেয়ে দামি পাথেয়। স্রোতের বিপরীতে যাঁরা দাঁড়ান, তাঁদের পিঠে চাপড় দিন— আগামীর টেকসই প্রতিষ্ঠান গড়তে এই চাপড়টাই বীজ বুনবে।


ডি এস কে টিভি চ্যানেল

চেয়ারম্যান ও সম্পাদকঃ সামসুল আলম
বার্তা সম্পাদকঃ মোঃ আসআদ

কপিরাইট © ২০২৫ ডি এস কে টিভি চ্যানেল