সিলেটের কিছু আসন আছে, যা নিয়ে আলোচনা যেন কখনও শেষই হয় না। কানাইঘাট আর জকিগঞ্জ উপজেলা নিয়ে সিলেট-৫ আসনটি ঠিক তেমনই এক রাজনৈতিক মঞ্চ। এখানে ভোটের সব হিসাব শুধু আওয়ামী লীগ বা বিএনপিকে দিয়ে মেলে না। জোটের রাজনীতি, আঞ্চলিক প্রভাব আর ব্যক্তিগত ইমেজ—এই তিনটি বিষয়ই এখানকার খেলার আসল চালিকাশক্তি। আর ঠিক এই কারণেই, এবারের রাজনৈতিক মাঠে সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত নামগুলোর একটি হলো মামুনুর রশিদ, যিনি সারাদেশে পরিচিত ‘চাকসু মামুন’ নামে।
সিলেটের রাজনীতিতে এখন আলোচনার কেন্দ্রে একটাই নাম—চাকসু মামুন। কিন্তু কে এই নেতা, যিনি দলের সবচেয়ে কঠিন সময়ে একাই মাঠে থেকে পুরো চিত্র পাল্টে দেওয়ার স্বপ্ন দেখাচ্ছেন? আর কেনই বা তাকে নিয়ে তৃণমূলের এত আশার পরেও জোটের রাজনীতি তার সামনে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে? চলুন, জেনে আসা যাক।
সিলেট-৫ আসনকে বিএনপির জন্য একটি ‘ত্যাগের আসন’ বললে
পরিসংখ্যান ঘাঁটলে দেখা যায়, গত তিন দশকে হাতে গোনা কয়েকবার ছাড়া বিএনপি এই আসনে নিজেদের দলীয় প্রতীক, ধানের শীষকে প্রার্থী দিতেই পারেনি। জোটের রাজনীতির জটিল সমীকরণে বারবার আসনটি ছেড়ে দিতে হয়েছে, কখনও জমিয়তে উলামায়ে ইসলামকে, আবার কখনও অন্য কোনো শরিক দলকে। ২০১৮ সালের নির্বাচনেও ঠিক একই দৃশ্য দেখা যায়। সেবার বিএনপি থেকে মনোনয়ন পেয়েও জোটের স্বার্থে শেষ মুহূর্তে সরে দাঁড়াতে হয়েছিল চাকসু মামুনকেই। ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী হয়েছিলেন জমিয়ত নেতা মাওলানা ওবায়দুল্লাহ ফারুক।
পরিসংখ্যান ঘাঁটলে দেখা যায়, গত তিন দশকে হাতে গোনা কয়েকবার ছাড়া বিএনপি এই আসনে নিজেদের দলীয় প্রতীক, ধানের শীষকে প্রার্থী দিতেই পারেনি। জোটের রাজনীতির জটিল সমীকরণে বারবার আসনটি ছেড়ে দিতে হয়েছে, কখনও জমিয়তে উলামায়ে ইসলামকে, আবার কখনও অন্য কোনো শরিক দলকে। ২০১৮ সালের নির্বাচনেও ঠিক একই দৃশ্য দেখা যায়। সেবার বিএনপি থেকে মনোনয়ন পেয়েও জোটের স্বার্থে শেষ মুহূর্তে সরে দাঁড়াতে হয়েছিল চাকসু মামুনকেই। ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী হয়েছিলেন জমিয়ত নেতা মাওলানা ওবায়দুল্লাহ ফারুক।
পরিসংখ্যান ঘাঁটলে দেখা যায়, গত তিন দশকে হাতে গোনা কয়েকবার ছাড়া বিএনপি এই আসনে নিজেদের দলীয় প্রতীক, ধানের শীষকে প্রার্থী দিতেই পারেনি। জোটের রাজনীতির জটিল সমীকরণে বারবার আসনটি ছেড়ে দিতে হয়েছে, কখনও জমিয়তে উলামায়ে ইসলামকে, আবার কখনও অন্য কোনো শরিক দলকে। ২০১৮ সালের নির্বাচনেও ঠিক একই দৃশ্য দেখা যায়। সেবার বিএনপি থেকে মনোনয়ন পেয়েও জোটের স্বার্থে শেষ মুহূর্তে সরে দাঁড়াতে হয়েছিল চাকসু মামুনকেই। ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী হয়েছিলেন জমিয়ত নেতা মাওলানা ওবায়দুল্লাহ ফারুক।
আসলে, কানাইঘাট-জকিগঞ্জের মাটি , প্রতিবার নির্বাচনের আগে বিএনপির হাইকমান্ডকে এক কঠিন উভয় সংকটে পড়তে হয়। একদিকে তৃণমূলের চাপ—যারা চায় নিজ দলের প্রার্থী, আর অন্যদিকে জোটের শরিকদের ধরে রাখার রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা।
আর ঠিক এই দীর্ঘ বঞ্চনার ইতিহাস থেকেই উঠে এসেছেন চাকসু মামুন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকাকালীন তার রাজনৈতিক জীবনের শুরু। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ বা ‘চাকসু’-র নির্বাচিত আপ্যায়ন সম্পাদক হিসেবে তিনি যে পরিচিতি পেয়েছিলেন, সেই ‘চাকসু’ পরিচয়টিই তার নামের সাথে স্থায়ী হয়ে যায়। সময়ের সাথে সাথে তিনি সিলেট জেলা বিএনপিতে নিজের জায়গা পাকা করেছেন এবং বর্তমানে জেলা বিএনপির প্রথম সহ-সভাপতির মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে আছেন। কিন্তু তার আসল পরিচয় হয়ে উঠেছে দলের দুঃসময়ের এক লড়াকু নেতা হিসেবে।
গত এক দশকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিএনপির জন্য কতটা প্রতিকূল ছিল, তা আমাদের সবারই জানা। যখন হামলা, মামলা আর গ্রেফতারের ভয়ে অনেক সিনিয়র নেতাও লোকচক্ষুর আড়ালে, তখন সিলেটের রাজপথে যে কয়েকটি মুখ নিয়মিত দেখা যেত, চাকসু মামুন তাদের মধ্যে একজন।
তিনি শুধু বক্তৃতা বা বিবৃতিতে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। শত শত মামলার বোঝা মাথায় নিয়েও কর্মীদের বিপদে-আপদে পাশে দাঁড়িয়েছেন। তার সবচেয়ে বড় শক্তি এটাই যে, তিনি পদ-পদবির অহংকারকে পাশে রেখে সাধারণ মানুষের সাথে মিশে যেতে পেরেছেন। যখন বন্যার পানিতে কানাইঘাট-জকিগঞ্জের বড় একটি অংশ ডুবে গিয়েছিল, তখন দুর্গম এলাকায় ত্রাণ হাতে ছুটে গেছেন। তার এই মানবিক কাজগুলো তাকে শুধু রাজনৈতিক কর্মী নয়, সাধারণ মানুষের কাছেও একজন আস্থার মানুষ করে তুলেছে।
তার জনপ্রিয়তার পেছনে কাজ করেছে তার রাখঢাকহীন কথাবার্তাও। তিনি কোনো ফিল্টার ছাড়াই কথা বলেন, যা অনেক সময় দলের ভেতরেও আলোচনার জন্ম দেয়। সম্প্রতি এক সমাবেশে তিনি বলেন, "আমি একমাত্র আল্লাহ ও জকিগঞ্জ–কানাইঘাটের মানুষের কাছে বিশ্বস্ত হতে চাই।" এই ধরনের সাহসী বক্তব্য তরুণ কর্মীদের দারুণভাবে আকর্ষণ করেছে। তারা এমন একজন নেতাকে পেয়েছে, যিনি তাদের মনের কথা বলেন এবং যেকোনো পরিস্থিতিতে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিতে ভয় পান না।
এই নিরবচ্ছিন্ন ছোটাছুটির ফলও তিনি পাচ্ছেন। তার প্রতিটি কর্মসূচিতে এখন হাজার হাজার নেতাকর্মীর ভিড় হয়, যা সিলেট-৫ আসনে বিএনপির অন্য কোনো মনোনয়ন প্রত্যাশীর ক্ষেত্রে চোখে পড়ে না। তৃণমূলের কর্মীরা এখন বিশ্বাস করতে শুরু করেছে, চাকসু মামুনের হাত ধরেই এই আসনে ধানের শীষের দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান হতে পারে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, তৃণমূলের এত সমর্থন আর ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তাই কি মনোনয়ন নিশ্চিত করার জন্য যথেষ্ট? এখানেই গল্পের আসল মোড়। চাকসু মামুনের মনোনয়ন পথের সবচেয়ে বড় বাধা তিনি নিজে বা দলের অন্য কোনো নেতা নন, বরং জোটের রাজনীতির সেই পুরনো হিসাব-নিকাশ।
জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম শুরু থেকেই সিলেট-৫ আসনটিকে নিজেদের বলে দাবি করে আসছে। দলের সভাপতি মাওলানা ওবায়দুল্লাহ ফারুক এই আসনের একজন হেভিওয়েট প্রার্থী এবং ২০১৮ সালেও তিনি জোটের প্রার্থী ছিলেন। তার মাদ্রাসাকেন্দ্রিক একটি বিশাল ভোটব্যাংক আছে এবং জমিয়ত কোনোভাবেই এই আসনটি ছাড়তে রাজি নয়। মাওলানা ফারুক এরই মধ্যে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, "জোট হলেও ভোটে আছি, না হলেও আছি।" তার এই ঘোষণা বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের ওপর এক বিরাট চাপ তৈরি করেছে।
বিএনপির হাইকমান্ডকে এখন পুরো দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নিয়ে ভাবতে হচ্ছে। সারাদেশে জোট টিকিয়ে রাখতে হলে কিছু আসনে ছাড় দেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে। আর সেই ত্যাগের তালিকায় কি আবারও সিলেট-৫-এর নাম উঠবে? এই প্রশ্নই এখন সবখানে ঘুরপাক খাচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে চাকসু মামুনও তার অবস্থান স্পষ্ট করে দিয়েছেন। তিনি একাধিকবার বলেছেন, এই আসনে আর কোনো 'স্যাক্রিফাইস' বা আত্মত্যাগ মেনে নেওয়া হবে না। এমনকি তিনি এমন হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন যে, যদি শেষ পর্যন্ত তাকে মনোনয়ন না দেওয়া হয়, তবে তার ফল ভালো হবে না। তার এই কঠোর অবস্থান একদিকে যেমন সমর্থকদের মনোবল বাড়িয়েছে, তেমনই দলের শীর্ষ নেতাদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। লড়াইটা এখন আর শুধু মনোনয়ন নিয়ে নয়; এটা এখন তৃণমূলের আবেগ আর কেন্দ্রের কৌশলের লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে।
তাহলে সিলেট-৫ আসনের ভবিষ্যৎ কী? কয়েকটি দৃশ্যপট নিয়ে ভাবা যেতে পারে।
এক, বিএনপি যদি সব জল্পনার অবসান ঘটিয়ে চাকসু মামুনকেই মনোনয়ন দেয়, তবে কানাইঘাট-জকিগঞ্জে বিএনপির নেতাকর্মীরা নিঃসন্দেহে উজ্জীবিত হবে। দীর্ঘদিন পর নিজেদের প্রার্থীকে পেয়ে তারা সর্বশক্তি দিয়ে মাঠে নামবে। কিন্তু তখন জমিয়তের প্রতিক্রিয়া কী হবে? মাওলানা ফারুক যদি একা প্রার্থী হন, তবে ভোটের মাঠে একটি ত্রিমুখী লড়াই হতে পারে, যেখানে ইসলামপন্থী ভোটগুলো ভাগ হয়ে যাবে। এর সুবিধা কি অন্য কোনো দল পাবে? এটা একটা বড় প্রশ্ন।
দুই, বিএনপি যদি পুরনো পথেই হাঁটে এবং জোটের স্বার্থে আসনটি আবারও জমিয়তকে ছেড়ে দেয়, তবে তার ফল হতে পারে মারাত্মক। চাকসু মামুনের সমর্থকরা এই সিদ্ধান্ত কতটা মেনে নেবেন, তা নিয়ে ঘোর সন্দেহ আছে। তখন চাকসু মামুন নিজে কী করবেন? দলের সিদ্ধান্ত মেনে চুপ থাকবেন, নাকি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মাঠে নামবেন? তিনি তার এক বক্তব্যে এমন ইঙ্গিতও দিয়ে রেখেছেন, "কোন প্রতীকে নির্বাচন করবো জানি না। তবে আপনারা যদি চান আমি 'বোতল মার্কা' নিয়েও দাঁড়াতে পারি।" যদি তিনি সত্যিই স্বতন্ত্র প্রার্থী হন, তবে সেটি বিএনপির জন্য এক বিরাট চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে।
আপাতত চাকসু মামুন আনুষ্ঠানিক ঘোষণার জন্য অপেক্ষা করছেন না। তিনি পুরো নির্বাচনী এলাকা চষে বেড়াচ্ছেন; প্রতিদিন সভা, সমাবেশ আর গণসংযোগ করে চলেছেন। তিনি তার শক্তি আর জনপ্রিয়তা দেখিয়ে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে একটাই বার্তা দিতে চাইছেন—সিলেট-৫ আসনে তাকে উপেক্ষা করা সহজ হবে না।
সব মিলিয়ে, চাকসু মামুনকে কেন্দ্র করে সিলেট-৫ আসনের রাজনীতি এক জটিল ও আকর্ষণীয় মোড়ে দাঁড়িয়ে। একদিকে দলের জন্য তার ত্যাগ, তৃণমূলের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা আর আপোষহীন মনোভাব, অন্যদিকে জোটের রাজনীতির কঠিন বাস্তবতা। তার এই উত্থান বিএনপির জন্য একই সাথে এক বিরাট সম্ভাবনা এবং এক বিরাট চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। তিনি কি পারবেন সব বাধা ডিঙিয়ে ধানের শীষের কাণ্ডারি হতে? নাকি জোটের রাজনীতির কাছে আরও একবার বলি হবে তৃণমূলের আকাঙ্ক্ষা? উত্তরটা হয়তো সময়ই বলে দেবে।
তবে একটা বিষয় পরিষ্কার—চাকসু মামুনকে ঘিরে যে আলোচনার ঝড় উঠেছে, তা প্রমাণ করে যে শুধু কাগজে-কলমে জোটের হিসাব মেলানো আর মাঠের বাস্তবতার মধ্যে অনেক পার্থক্য থাকতে পারে।
এখন প্রশ্ন আপনাদের কাছে: এই পরিস্থিতিতে বিএনপির কী করা উচিত বলে আপনি মনে করেন? চাকসু মামুনকে মনোনয়ন দেওয়া, নাকি জোটের জন্য আসনটি ছেড়ে দেওয়া? আপনার মতামত আমাদের কমেন্ট সেকশনে জানান।

শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৪ নভেম্বর ২০২৫
সিলেটের কিছু আসন আছে, যা নিয়ে আলোচনা যেন কখনও শেষই হয় না। কানাইঘাট আর জকিগঞ্জ উপজেলা নিয়ে সিলেট-৫ আসনটি ঠিক তেমনই এক রাজনৈতিক মঞ্চ। এখানে ভোটের সব হিসাব শুধু আওয়ামী লীগ বা বিএনপিকে দিয়ে মেলে না। জোটের রাজনীতি, আঞ্চলিক প্রভাব আর ব্যক্তিগত ইমেজ—এই তিনটি বিষয়ই এখানকার খেলার আসল চালিকাশক্তি। আর ঠিক এই কারণেই, এবারের রাজনৈতিক মাঠে সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত নামগুলোর একটি হলো মামুনুর রশিদ, যিনি সারাদেশে পরিচিত ‘চাকসু মামুন’ নামে।
সিলেটের রাজনীতিতে এখন আলোচনার কেন্দ্রে একটাই নাম—চাকসু মামুন। কিন্তু কে এই নেতা, যিনি দলের সবচেয়ে কঠিন সময়ে একাই মাঠে থেকে পুরো চিত্র পাল্টে দেওয়ার স্বপ্ন দেখাচ্ছেন? আর কেনই বা তাকে নিয়ে তৃণমূলের এত আশার পরেও জোটের রাজনীতি তার সামনে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে? চলুন, জেনে আসা যাক।
সিলেট-৫ আসনকে বিএনপির জন্য একটি ‘ত্যাগের আসন’ বললে
পরিসংখ্যান ঘাঁটলে দেখা যায়, গত তিন দশকে হাতে গোনা কয়েকবার ছাড়া বিএনপি এই আসনে নিজেদের দলীয় প্রতীক, ধানের শীষকে প্রার্থী দিতেই পারেনি। জোটের রাজনীতির জটিল সমীকরণে বারবার আসনটি ছেড়ে দিতে হয়েছে, কখনও জমিয়তে উলামায়ে ইসলামকে, আবার কখনও অন্য কোনো শরিক দলকে। ২০১৮ সালের নির্বাচনেও ঠিক একই দৃশ্য দেখা যায়। সেবার বিএনপি থেকে মনোনয়ন পেয়েও জোটের স্বার্থে শেষ মুহূর্তে সরে দাঁড়াতে হয়েছিল চাকসু মামুনকেই। ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী হয়েছিলেন জমিয়ত নেতা মাওলানা ওবায়দুল্লাহ ফারুক।
পরিসংখ্যান ঘাঁটলে দেখা যায়, গত তিন দশকে হাতে গোনা কয়েকবার ছাড়া বিএনপি এই আসনে নিজেদের দলীয় প্রতীক, ধানের শীষকে প্রার্থী দিতেই পারেনি। জোটের রাজনীতির জটিল সমীকরণে বারবার আসনটি ছেড়ে দিতে হয়েছে, কখনও জমিয়তে উলামায়ে ইসলামকে, আবার কখনও অন্য কোনো শরিক দলকে। ২০১৮ সালের নির্বাচনেও ঠিক একই দৃশ্য দেখা যায়। সেবার বিএনপি থেকে মনোনয়ন পেয়েও জোটের স্বার্থে শেষ মুহূর্তে সরে দাঁড়াতে হয়েছিল চাকসু মামুনকেই। ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী হয়েছিলেন জমিয়ত নেতা মাওলানা ওবায়দুল্লাহ ফারুক।
পরিসংখ্যান ঘাঁটলে দেখা যায়, গত তিন দশকে হাতে গোনা কয়েকবার ছাড়া বিএনপি এই আসনে নিজেদের দলীয় প্রতীক, ধানের শীষকে প্রার্থী দিতেই পারেনি। জোটের রাজনীতির জটিল সমীকরণে বারবার আসনটি ছেড়ে দিতে হয়েছে, কখনও জমিয়তে উলামায়ে ইসলামকে, আবার কখনও অন্য কোনো শরিক দলকে। ২০১৮ সালের নির্বাচনেও ঠিক একই দৃশ্য দেখা যায়। সেবার বিএনপি থেকে মনোনয়ন পেয়েও জোটের স্বার্থে শেষ মুহূর্তে সরে দাঁড়াতে হয়েছিল চাকসু মামুনকেই। ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী হয়েছিলেন জমিয়ত নেতা মাওলানা ওবায়দুল্লাহ ফারুক।
আসলে, কানাইঘাট-জকিগঞ্জের মাটি , প্রতিবার নির্বাচনের আগে বিএনপির হাইকমান্ডকে এক কঠিন উভয় সংকটে পড়তে হয়। একদিকে তৃণমূলের চাপ—যারা চায় নিজ দলের প্রার্থী, আর অন্যদিকে জোটের শরিকদের ধরে রাখার রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা।
আর ঠিক এই দীর্ঘ বঞ্চনার ইতিহাস থেকেই উঠে এসেছেন চাকসু মামুন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকাকালীন তার রাজনৈতিক জীবনের শুরু। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ বা ‘চাকসু’-র নির্বাচিত আপ্যায়ন সম্পাদক হিসেবে তিনি যে পরিচিতি পেয়েছিলেন, সেই ‘চাকসু’ পরিচয়টিই তার নামের সাথে স্থায়ী হয়ে যায়। সময়ের সাথে সাথে তিনি সিলেট জেলা বিএনপিতে নিজের জায়গা পাকা করেছেন এবং বর্তমানে জেলা বিএনপির প্রথম সহ-সভাপতির মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে আছেন। কিন্তু তার আসল পরিচয় হয়ে উঠেছে দলের দুঃসময়ের এক লড়াকু নেতা হিসেবে।
গত এক দশকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিএনপির জন্য কতটা প্রতিকূল ছিল, তা আমাদের সবারই জানা। যখন হামলা, মামলা আর গ্রেফতারের ভয়ে অনেক সিনিয়র নেতাও লোকচক্ষুর আড়ালে, তখন সিলেটের রাজপথে যে কয়েকটি মুখ নিয়মিত দেখা যেত, চাকসু মামুন তাদের মধ্যে একজন।
তিনি শুধু বক্তৃতা বা বিবৃতিতে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। শত শত মামলার বোঝা মাথায় নিয়েও কর্মীদের বিপদে-আপদে পাশে দাঁড়িয়েছেন। তার সবচেয়ে বড় শক্তি এটাই যে, তিনি পদ-পদবির অহংকারকে পাশে রেখে সাধারণ মানুষের সাথে মিশে যেতে পেরেছেন। যখন বন্যার পানিতে কানাইঘাট-জকিগঞ্জের বড় একটি অংশ ডুবে গিয়েছিল, তখন দুর্গম এলাকায় ত্রাণ হাতে ছুটে গেছেন। তার এই মানবিক কাজগুলো তাকে শুধু রাজনৈতিক কর্মী নয়, সাধারণ মানুষের কাছেও একজন আস্থার মানুষ করে তুলেছে।
তার জনপ্রিয়তার পেছনে কাজ করেছে তার রাখঢাকহীন কথাবার্তাও। তিনি কোনো ফিল্টার ছাড়াই কথা বলেন, যা অনেক সময় দলের ভেতরেও আলোচনার জন্ম দেয়। সম্প্রতি এক সমাবেশে তিনি বলেন, "আমি একমাত্র আল্লাহ ও জকিগঞ্জ–কানাইঘাটের মানুষের কাছে বিশ্বস্ত হতে চাই।" এই ধরনের সাহসী বক্তব্য তরুণ কর্মীদের দারুণভাবে আকর্ষণ করেছে। তারা এমন একজন নেতাকে পেয়েছে, যিনি তাদের মনের কথা বলেন এবং যেকোনো পরিস্থিতিতে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিতে ভয় পান না।
এই নিরবচ্ছিন্ন ছোটাছুটির ফলও তিনি পাচ্ছেন। তার প্রতিটি কর্মসূচিতে এখন হাজার হাজার নেতাকর্মীর ভিড় হয়, যা সিলেট-৫ আসনে বিএনপির অন্য কোনো মনোনয়ন প্রত্যাশীর ক্ষেত্রে চোখে পড়ে না। তৃণমূলের কর্মীরা এখন বিশ্বাস করতে শুরু করেছে, চাকসু মামুনের হাত ধরেই এই আসনে ধানের শীষের দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান হতে পারে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, তৃণমূলের এত সমর্থন আর ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তাই কি মনোনয়ন নিশ্চিত করার জন্য যথেষ্ট? এখানেই গল্পের আসল মোড়। চাকসু মামুনের মনোনয়ন পথের সবচেয়ে বড় বাধা তিনি নিজে বা দলের অন্য কোনো নেতা নন, বরং জোটের রাজনীতির সেই পুরনো হিসাব-নিকাশ।
জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম শুরু থেকেই সিলেট-৫ আসনটিকে নিজেদের বলে দাবি করে আসছে। দলের সভাপতি মাওলানা ওবায়দুল্লাহ ফারুক এই আসনের একজন হেভিওয়েট প্রার্থী এবং ২০১৮ সালেও তিনি জোটের প্রার্থী ছিলেন। তার মাদ্রাসাকেন্দ্রিক একটি বিশাল ভোটব্যাংক আছে এবং জমিয়ত কোনোভাবেই এই আসনটি ছাড়তে রাজি নয়। মাওলানা ফারুক এরই মধ্যে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, "জোট হলেও ভোটে আছি, না হলেও আছি।" তার এই ঘোষণা বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের ওপর এক বিরাট চাপ তৈরি করেছে।
বিএনপির হাইকমান্ডকে এখন পুরো দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নিয়ে ভাবতে হচ্ছে। সারাদেশে জোট টিকিয়ে রাখতে হলে কিছু আসনে ছাড় দেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে। আর সেই ত্যাগের তালিকায় কি আবারও সিলেট-৫-এর নাম উঠবে? এই প্রশ্নই এখন সবখানে ঘুরপাক খাচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে চাকসু মামুনও তার অবস্থান স্পষ্ট করে দিয়েছেন। তিনি একাধিকবার বলেছেন, এই আসনে আর কোনো 'স্যাক্রিফাইস' বা আত্মত্যাগ মেনে নেওয়া হবে না। এমনকি তিনি এমন হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন যে, যদি শেষ পর্যন্ত তাকে মনোনয়ন না দেওয়া হয়, তবে তার ফল ভালো হবে না। তার এই কঠোর অবস্থান একদিকে যেমন সমর্থকদের মনোবল বাড়িয়েছে, তেমনই দলের শীর্ষ নেতাদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। লড়াইটা এখন আর শুধু মনোনয়ন নিয়ে নয়; এটা এখন তৃণমূলের আবেগ আর কেন্দ্রের কৌশলের লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে।
তাহলে সিলেট-৫ আসনের ভবিষ্যৎ কী? কয়েকটি দৃশ্যপট নিয়ে ভাবা যেতে পারে।
এক, বিএনপি যদি সব জল্পনার অবসান ঘটিয়ে চাকসু মামুনকেই মনোনয়ন দেয়, তবে কানাইঘাট-জকিগঞ্জে বিএনপির নেতাকর্মীরা নিঃসন্দেহে উজ্জীবিত হবে। দীর্ঘদিন পর নিজেদের প্রার্থীকে পেয়ে তারা সর্বশক্তি দিয়ে মাঠে নামবে। কিন্তু তখন জমিয়তের প্রতিক্রিয়া কী হবে? মাওলানা ফারুক যদি একা প্রার্থী হন, তবে ভোটের মাঠে একটি ত্রিমুখী লড়াই হতে পারে, যেখানে ইসলামপন্থী ভোটগুলো ভাগ হয়ে যাবে। এর সুবিধা কি অন্য কোনো দল পাবে? এটা একটা বড় প্রশ্ন।
দুই, বিএনপি যদি পুরনো পথেই হাঁটে এবং জোটের স্বার্থে আসনটি আবারও জমিয়তকে ছেড়ে দেয়, তবে তার ফল হতে পারে মারাত্মক। চাকসু মামুনের সমর্থকরা এই সিদ্ধান্ত কতটা মেনে নেবেন, তা নিয়ে ঘোর সন্দেহ আছে। তখন চাকসু মামুন নিজে কী করবেন? দলের সিদ্ধান্ত মেনে চুপ থাকবেন, নাকি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মাঠে নামবেন? তিনি তার এক বক্তব্যে এমন ইঙ্গিতও দিয়ে রেখেছেন, "কোন প্রতীকে নির্বাচন করবো জানি না। তবে আপনারা যদি চান আমি 'বোতল মার্কা' নিয়েও দাঁড়াতে পারি।" যদি তিনি সত্যিই স্বতন্ত্র প্রার্থী হন, তবে সেটি বিএনপির জন্য এক বিরাট চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে।
আপাতত চাকসু মামুন আনুষ্ঠানিক ঘোষণার জন্য অপেক্ষা করছেন না। তিনি পুরো নির্বাচনী এলাকা চষে বেড়াচ্ছেন; প্রতিদিন সভা, সমাবেশ আর গণসংযোগ করে চলেছেন। তিনি তার শক্তি আর জনপ্রিয়তা দেখিয়ে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে একটাই বার্তা দিতে চাইছেন—সিলেট-৫ আসনে তাকে উপেক্ষা করা সহজ হবে না।
সব মিলিয়ে, চাকসু মামুনকে কেন্দ্র করে সিলেট-৫ আসনের রাজনীতি এক জটিল ও আকর্ষণীয় মোড়ে দাঁড়িয়ে। একদিকে দলের জন্য তার ত্যাগ, তৃণমূলের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা আর আপোষহীন মনোভাব, অন্যদিকে জোটের রাজনীতির কঠিন বাস্তবতা। তার এই উত্থান বিএনপির জন্য একই সাথে এক বিরাট সম্ভাবনা এবং এক বিরাট চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। তিনি কি পারবেন সব বাধা ডিঙিয়ে ধানের শীষের কাণ্ডারি হতে? নাকি জোটের রাজনীতির কাছে আরও একবার বলি হবে তৃণমূলের আকাঙ্ক্ষা? উত্তরটা হয়তো সময়ই বলে দেবে।
তবে একটা বিষয় পরিষ্কার—চাকসু মামুনকে ঘিরে যে আলোচনার ঝড় উঠেছে, তা প্রমাণ করে যে শুধু কাগজে-কলমে জোটের হিসাব মেলানো আর মাঠের বাস্তবতার মধ্যে অনেক পার্থক্য থাকতে পারে।
এখন প্রশ্ন আপনাদের কাছে: এই পরিস্থিতিতে বিএনপির কী করা উচিত বলে আপনি মনে করেন? চাকসু মামুনকে মনোনয়ন দেওয়া, নাকি জোটের জন্য আসনটি ছেড়ে দেওয়া? আপনার মতামত আমাদের কমেন্ট সেকশনে জানান।

আপনার মতামত লিখুন