শহীদ হাদির রেখে যাওয়া অসমাপ্ত বিপ্লব
হাদির কণ্ঠস্বরএই শাহবাগ হাজার বছরের মুসলমানদের কাছ থেকে বঙ্গভূমির স্বাধীনতা কেড়ে নিয়েছে, এখান থেকে ফ্যাসিবাদের জন্ম। আমি এখানেই নারায়ে তাকবির স্লোগান দেব!"
(ভাষণের শব্দ মিলিয়ে গিয়ে একটি শান্ত, কিন্তু গম্ভীর আবহ তৈরি হবে)
একজন বিপ্লবীর মৃত্যু কি সত্যিই একটা বিপ্লবের শেষ? নাকি লক্ষ কোটি নতুন বিপ্লবীর জন্ম? ২০২৫ সালের ১৮ই ডিসেম্বর—এই প্রশ্নটাই বাংলাদেশের প্রত্যেকটা মানুষের মনে গেঁথে দিয়ে গেছেন জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অগ্নিপুরুষ, ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র, শহীদ শরীফ ওসমান বিন হাদি। যে তরুণ আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে নিজের জীবন বিলিয়ে দিলেন, তার শাহাদাত কি একটি যুগের অবসান, নাকি আরও বড় কোনো সংগ্রামের শুরু?
কে ছিলেন এই শরীফ ওসমান হাদি? কেন তার জন্য আজ লক্ষ মানুষ কাঁদছে আর কেনই বা তার কণ্ঠ কোটি মানুষের প্রতিবাদের ভাষা হয়ে উঠেছিল?
১৯৯৩ সালে ঝালকাঠি জেলার নলছিটি উপজেলার এক সাধারণ মুসলিম পরিবারে হাদির জন্ম। তার বাবা, মাওলানা শরীফ আব্দুল হাদি, ছিলেন একজন মাদ্রাসা শিক্ষক ও স্থানীয় ইমাম। ঢাকার রামপুরায় খুব সাধারণ একটা ভাড়া বাসায় থাকতেন তিনি। পেশায় একজন শিক্ষক ও লেখক হলেও তার আসল পরিচয় ছিল—তিনি সত্যের পথে এক আপোষহীন যোদ্ধা।
২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসের এক মোড় ঘোরানো অধ্যায়। স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে সেই উত্তাল সময়ে, রামপুরা এলাকার একজন লড়াকু সংগঠক হিসেবে হাদির উত্থান। তার আপোষহীন নেতৃত্ব, সাদামাটা জীবন আর অন্যায়ের বিরুদ্ধে বজ্রকণ্ঠ তাকে দ্রুতই ছাত্র-জনতার চোখের মণি করে তোলে।
তিনি বিশ্বাস করতেন, "প্রকৃত মুসলমান সেই, যার হাত ও জিহ্বা থেকে অন্য মুসলমান নিরাপদ।" রাসূল (সা.)-এর এই হাদিসকে ধারণ করেই তিনি সব ধরনের জুলুম, ফ্যাসিবাদ আর আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে লড়েছেন। তিনি প্রায়ই বলতেন, এই সংগ্রাম আজকের নয়। এ হলো হকের সংগ্রাম, যা হাবিল-কাবিল থেকে শুরু করে ফেরাউন-মূসা পর্যন্ত যুগে যুগে চলে এসেছে।
গণঅভ্যুত্থানের পর যখন সবাই একটা নতুন বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখছে, হাদি তখন প্রতিষ্ঠা করেন "ইনকিলাব মঞ্চ"। লক্ষ্য একটাই—সব আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা এবং ন্যায়বিচারভিত্তিক একটি রাষ্ট্র তৈরি করা।
যে শাহবাগকে অনেকে ২০১৩ সালে ফ্যাসিবাদ আর নাস্তিকতার কেন্দ্র মনে করত, সেই শাহবাগে দাঁড়িয়েই হাদি তার ঐতিহাসিক ঘোষণা দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, এই শাহবাগ থেকেই তিনি ফ্যাসিবাদকে রুখে দেবেন। তার এই অসীম সাহস তাকে জীবন্ত কিংবদন্তীতে পরিণত করেছিল। তিনি শুধু একজন নেতাই ছিলেন না, ছিলেন সাংস্কৃতিক বিপ্লবের প্রতীক আর আধিপত্যমুক্ত বাংলাদেশের সবচেয়ে জোরালো কণ্ঠস্বর।
কিন্তু যে কণ্ঠ স্বৈরাচারের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিল, তাকে থামিয়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্র চলছিল অনেক আগে থেকেই। শহীদ হাদি তার ফেসবুক পোস্টে বেশ কয়েকবার মৃত্যুর হুমকির কথা জানিয়েছিলেন। তিনি লিখেছিলেন, "আওয়ামী লীগের খুনিরা আমার পরিবারকে হুমকি দিচ্ছে, কিন্তু এক হাদিকে হত্যা করলে আল্লাহ লক্ষ হাদি তৈরি করবেন।"
সেই আশঙ্কাই সত্যি হলো। ২০২৫ সালের ১২ই ডিসেম্বর, শুক্রবার। জুমার নামাজের পর ঢাকার বিজয়নগরের বক্স কালভার্ট এলাকায় নির্বাচনী প্রচারণায় যাওয়ার পথে, মোটরসাইকেলে আসা অজ্ঞাত সন্ত্রাসীরা তাকে গুলি করে। গুলিটি তার মাথার ডান পাশ দিয়ে ঢুকে যায়।
সারা দেশ প্রার্থনায় ডুবে ছিল। ঢাকা মেডিকেল থেকে সিঙ্গাপুর—সবচেয়ে ভালো চিকিৎসার কোনো কমতি রাখা হয়নি। কিন্তু সব চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে ১৮ই ডিসেম্বর রাতে তিনি শাহাদাত বরণ করেন। একটি সম্ভাবনার প্রদীপ নিভে গেল, কিন্তু জ্বালিয়ে দিয়ে গেল বিপ্লবের এক অন্তহীন শিখা।
তার মৃত্যুতে সরকার একদিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করে। ২০শে ডিসেম্বর, মানিক মিয়া এভিনিউ থেকে সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজা পর্যন্ত নেমেছিল মানুষের ঢল। লক্ষ লক্ষ মানুষ তার জানাজায় অংশ নেয়, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব ঘটনা। এটা শুধু একটা জানাজা ছিল না, ছিল জালিমের বিরুদ্ধে মজলুমের নীরব গর্জন। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সমাধির পাশে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাকে দাফন করা হয়। একজন বিদ্রোহী কবির পাশেই চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন আরেকজন আপোষহীন বিপ্লবী।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, হাদিকে সরিয়ে দিয়ে যারা এই বিপ্লবকে থামিয়ে দিতে চেয়েছিল, তারা কি আসলেই সফল হয়েছে
কী ছিল হাদির সেই অসমাপ্ত বিপ্লব? তিনি এমন এক সার্বভৌম বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখতেন, যেখানে কোনো দলের আধিপত্য থাকবে না, থাকবে না বিদেশি শক্তির তাঁবেদারি। তিনি বলতেন, এই দেশ কোনো ব্যক্তি বা দলের নয়, এই দেশ ১৮ কোটি মানুষের। ইনকিলাব মঞ্চের মাধ্যমে তিনি সেই লক্ষ্যেই কাজ করছিলেন। তাদের দাবি ছিল স্পষ্ট—গণহত্যাকারী দল হিসেবে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা, জুলাই বিপ্লবের যোদ্ধাদের নিরাপত্তা দেওয়া এবং দেশকে সন্ত্রাসমুক্ত করা
হাদির শাহাদাতের পর তার রেখে যাওয়া সেই বিপ্লবের পতাকা এখন কার হাতে?
শহীদ হাদির জানাজায় দাঁড়িয়ে তার মেজো ভাই ওমর বিন হাদি কোনো সাহায্য বা অনুদান চাননি। তিনি শুধু কান্নাভেজা কণ্ঠে জনতার কাছে একটা প্রশ্ন রেখেছিলেন। তিনি বলেছিলেন: "আমি শহীদের ভাই হতে চাইনি। আমি চেয়েছিলাম রাজপথে বিপ্লবী ওসমানের পাশে থেকে এই বাংলাদেশকে আধিপত্যবাদ মুক্ত করতে। ইনসাফের বাংলাদেশ গঠন না হওয়া পর্যন্ত আমরা রাজপথ ছাড়ব না। কিন্তু আজকে ওসমান চলে গেছেন... একটাই চাওয়া—আমার ভাইয়ের অসমাপ্ত বিপ্লবকে আপনারা সমাপ্ত করবেন। আপনারা শান্ত হবেন না।"
এই একটা বাক্যই शायद সবকিছুর উত্তর। হাদির মৃত্যু কোনো যুগের অবসান নয়, বরং এক নতুন সংগ্রামের শুরু। এক হাদির রক্ত থেকে আজ জন্ম নিয়েছে কোটি হাদি।
ইনকিলাব মঞ্চ ঘোষণা দিয়েছে, "হাদিকে যারা খুন করেছে, তাদের হাতে দেশ তুলে দেবেন না।" তারা ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে এক মাসের ভেতর এই হত্যাকাণ্ডের বিচার চেয়েছে। তারা সাফ জানিয়ে দিয়েছে, এই বিচার না হলে কোনো নির্বাচন নয়।
হাদির স্বপ্ন পূরণের দায়িত্ব এখন আর কোনো একজন নেতা বা সংগঠনের নয়। এই দায়িত্ব আজ বাংলাদেশের প্রতিটি ছাত্র, যুবক আর সাধারণ মানুষের কাঁধে। এই দায়িত্ব আমাদের সবার।
কীভাবে হাদির মতো হওয়া যায়? তার সহযোদ্ধারাই পথ দেখিয়েছেন। আমাদের এক হয়ে শহীদ হাদি আর জুলাইয়ের সকল শহীদের হত্যাকাণ্ডের দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে সরকারকে বাধ্য করতে হবে। রাজপথে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের মাধ্যমে আধিপত্যমুক্ত, সার্বভৌম বাংলাদেশ গড়ার সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে। আর সবচেয়ে বড় কথা, যেকোনো সহিংসতা বা ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে সজাগ থাকতে হবে, যা দেশকে আবার অস্থিতিশীল করতে পারে।
শরীফ ওসমান হাদি জীবন দিয়ে প্রমাণ করে গেছেন, আদর্শের কোনো মৃত্যু নেই। তার কণ্ঠ হয়তো থেমে গেছে, কিন্তু তার কথাগুলো আজ কোটি মানুষের স্লোগান। তার দেখানো স্বপ্ন আজ আমাদের সবার চোখে।
আপনি যদি শহীদ হাদির আদর্শে বিশ্বাস করেন, যদি আপনিও একটা ইনসাফভিত্তিক ও সার্বভৌম বাংলাদেশ দেখতে চান, তাহলে এই ভিডিওটি শেয়ার করে ছড়িয়ে দিন। কমেন্টে লিখুন, "বাংলাদেশ গড়তে হলে, হাদির মতো হতে হবে"। আপনার প্রতিটি শেয়ার, প্রতিটি কমেন্ট এই অসমাপ্ত বিপ্লবকে এগিয়ে নেওয়ার এক একটি পদক্ষেপ।

রোববার, ০১ মার্চ ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৩ ডিসেম্বর ২০২৫
শহীদ হাদির রেখে যাওয়া অসমাপ্ত বিপ্লব
হাদির কণ্ঠস্বরএই শাহবাগ হাজার বছরের মুসলমানদের কাছ থেকে বঙ্গভূমির স্বাধীনতা কেড়ে নিয়েছে, এখান থেকে ফ্যাসিবাদের জন্ম। আমি এখানেই নারায়ে তাকবির স্লোগান দেব!"
(ভাষণের শব্দ মিলিয়ে গিয়ে একটি শান্ত, কিন্তু গম্ভীর আবহ তৈরি হবে)
একজন বিপ্লবীর মৃত্যু কি সত্যিই একটা বিপ্লবের শেষ? নাকি লক্ষ কোটি নতুন বিপ্লবীর জন্ম? ২০২৫ সালের ১৮ই ডিসেম্বর—এই প্রশ্নটাই বাংলাদেশের প্রত্যেকটা মানুষের মনে গেঁথে দিয়ে গেছেন জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অগ্নিপুরুষ, ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র, শহীদ শরীফ ওসমান বিন হাদি। যে তরুণ আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে নিজের জীবন বিলিয়ে দিলেন, তার শাহাদাত কি একটি যুগের অবসান, নাকি আরও বড় কোনো সংগ্রামের শুরু?
কে ছিলেন এই শরীফ ওসমান হাদি? কেন তার জন্য আজ লক্ষ মানুষ কাঁদছে আর কেনই বা তার কণ্ঠ কোটি মানুষের প্রতিবাদের ভাষা হয়ে উঠেছিল?
১৯৯৩ সালে ঝালকাঠি জেলার নলছিটি উপজেলার এক সাধারণ মুসলিম পরিবারে হাদির জন্ম। তার বাবা, মাওলানা শরীফ আব্দুল হাদি, ছিলেন একজন মাদ্রাসা শিক্ষক ও স্থানীয় ইমাম। ঢাকার রামপুরায় খুব সাধারণ একটা ভাড়া বাসায় থাকতেন তিনি। পেশায় একজন শিক্ষক ও লেখক হলেও তার আসল পরিচয় ছিল—তিনি সত্যের পথে এক আপোষহীন যোদ্ধা।
২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসের এক মোড় ঘোরানো অধ্যায়। স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে সেই উত্তাল সময়ে, রামপুরা এলাকার একজন লড়াকু সংগঠক হিসেবে হাদির উত্থান। তার আপোষহীন নেতৃত্ব, সাদামাটা জীবন আর অন্যায়ের বিরুদ্ধে বজ্রকণ্ঠ তাকে দ্রুতই ছাত্র-জনতার চোখের মণি করে তোলে।
তিনি বিশ্বাস করতেন, "প্রকৃত মুসলমান সেই, যার হাত ও জিহ্বা থেকে অন্য মুসলমান নিরাপদ।" রাসূল (সা.)-এর এই হাদিসকে ধারণ করেই তিনি সব ধরনের জুলুম, ফ্যাসিবাদ আর আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে লড়েছেন। তিনি প্রায়ই বলতেন, এই সংগ্রাম আজকের নয়। এ হলো হকের সংগ্রাম, যা হাবিল-কাবিল থেকে শুরু করে ফেরাউন-মূসা পর্যন্ত যুগে যুগে চলে এসেছে।
গণঅভ্যুত্থানের পর যখন সবাই একটা নতুন বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখছে, হাদি তখন প্রতিষ্ঠা করেন "ইনকিলাব মঞ্চ"। লক্ষ্য একটাই—সব আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা এবং ন্যায়বিচারভিত্তিক একটি রাষ্ট্র তৈরি করা।
যে শাহবাগকে অনেকে ২০১৩ সালে ফ্যাসিবাদ আর নাস্তিকতার কেন্দ্র মনে করত, সেই শাহবাগে দাঁড়িয়েই হাদি তার ঐতিহাসিক ঘোষণা দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, এই শাহবাগ থেকেই তিনি ফ্যাসিবাদকে রুখে দেবেন। তার এই অসীম সাহস তাকে জীবন্ত কিংবদন্তীতে পরিণত করেছিল। তিনি শুধু একজন নেতাই ছিলেন না, ছিলেন সাংস্কৃতিক বিপ্লবের প্রতীক আর আধিপত্যমুক্ত বাংলাদেশের সবচেয়ে জোরালো কণ্ঠস্বর।
কিন্তু যে কণ্ঠ স্বৈরাচারের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিল, তাকে থামিয়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্র চলছিল অনেক আগে থেকেই। শহীদ হাদি তার ফেসবুক পোস্টে বেশ কয়েকবার মৃত্যুর হুমকির কথা জানিয়েছিলেন। তিনি লিখেছিলেন, "আওয়ামী লীগের খুনিরা আমার পরিবারকে হুমকি দিচ্ছে, কিন্তু এক হাদিকে হত্যা করলে আল্লাহ লক্ষ হাদি তৈরি করবেন।"
সেই আশঙ্কাই সত্যি হলো। ২০২৫ সালের ১২ই ডিসেম্বর, শুক্রবার। জুমার নামাজের পর ঢাকার বিজয়নগরের বক্স কালভার্ট এলাকায় নির্বাচনী প্রচারণায় যাওয়ার পথে, মোটরসাইকেলে আসা অজ্ঞাত সন্ত্রাসীরা তাকে গুলি করে। গুলিটি তার মাথার ডান পাশ দিয়ে ঢুকে যায়।
সারা দেশ প্রার্থনায় ডুবে ছিল। ঢাকা মেডিকেল থেকে সিঙ্গাপুর—সবচেয়ে ভালো চিকিৎসার কোনো কমতি রাখা হয়নি। কিন্তু সব চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে ১৮ই ডিসেম্বর রাতে তিনি শাহাদাত বরণ করেন। একটি সম্ভাবনার প্রদীপ নিভে গেল, কিন্তু জ্বালিয়ে দিয়ে গেল বিপ্লবের এক অন্তহীন শিখা।
তার মৃত্যুতে সরকার একদিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করে। ২০শে ডিসেম্বর, মানিক মিয়া এভিনিউ থেকে সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজা পর্যন্ত নেমেছিল মানুষের ঢল। লক্ষ লক্ষ মানুষ তার জানাজায় অংশ নেয়, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব ঘটনা। এটা শুধু একটা জানাজা ছিল না, ছিল জালিমের বিরুদ্ধে মজলুমের নীরব গর্জন। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সমাধির পাশে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাকে দাফন করা হয়। একজন বিদ্রোহী কবির পাশেই চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন আরেকজন আপোষহীন বিপ্লবী।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, হাদিকে সরিয়ে দিয়ে যারা এই বিপ্লবকে থামিয়ে দিতে চেয়েছিল, তারা কি আসলেই সফল হয়েছে
কী ছিল হাদির সেই অসমাপ্ত বিপ্লব? তিনি এমন এক সার্বভৌম বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখতেন, যেখানে কোনো দলের আধিপত্য থাকবে না, থাকবে না বিদেশি শক্তির তাঁবেদারি। তিনি বলতেন, এই দেশ কোনো ব্যক্তি বা দলের নয়, এই দেশ ১৮ কোটি মানুষের। ইনকিলাব মঞ্চের মাধ্যমে তিনি সেই লক্ষ্যেই কাজ করছিলেন। তাদের দাবি ছিল স্পষ্ট—গণহত্যাকারী দল হিসেবে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা, জুলাই বিপ্লবের যোদ্ধাদের নিরাপত্তা দেওয়া এবং দেশকে সন্ত্রাসমুক্ত করা
হাদির শাহাদাতের পর তার রেখে যাওয়া সেই বিপ্লবের পতাকা এখন কার হাতে?
শহীদ হাদির জানাজায় দাঁড়িয়ে তার মেজো ভাই ওমর বিন হাদি কোনো সাহায্য বা অনুদান চাননি। তিনি শুধু কান্নাভেজা কণ্ঠে জনতার কাছে একটা প্রশ্ন রেখেছিলেন। তিনি বলেছিলেন: "আমি শহীদের ভাই হতে চাইনি। আমি চেয়েছিলাম রাজপথে বিপ্লবী ওসমানের পাশে থেকে এই বাংলাদেশকে আধিপত্যবাদ মুক্ত করতে। ইনসাফের বাংলাদেশ গঠন না হওয়া পর্যন্ত আমরা রাজপথ ছাড়ব না। কিন্তু আজকে ওসমান চলে গেছেন... একটাই চাওয়া—আমার ভাইয়ের অসমাপ্ত বিপ্লবকে আপনারা সমাপ্ত করবেন। আপনারা শান্ত হবেন না।"
এই একটা বাক্যই शायद সবকিছুর উত্তর। হাদির মৃত্যু কোনো যুগের অবসান নয়, বরং এক নতুন সংগ্রামের শুরু। এক হাদির রক্ত থেকে আজ জন্ম নিয়েছে কোটি হাদি।
ইনকিলাব মঞ্চ ঘোষণা দিয়েছে, "হাদিকে যারা খুন করেছে, তাদের হাতে দেশ তুলে দেবেন না।" তারা ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে এক মাসের ভেতর এই হত্যাকাণ্ডের বিচার চেয়েছে। তারা সাফ জানিয়ে দিয়েছে, এই বিচার না হলে কোনো নির্বাচন নয়।
হাদির স্বপ্ন পূরণের দায়িত্ব এখন আর কোনো একজন নেতা বা সংগঠনের নয়। এই দায়িত্ব আজ বাংলাদেশের প্রতিটি ছাত্র, যুবক আর সাধারণ মানুষের কাঁধে। এই দায়িত্ব আমাদের সবার।
কীভাবে হাদির মতো হওয়া যায়? তার সহযোদ্ধারাই পথ দেখিয়েছেন। আমাদের এক হয়ে শহীদ হাদি আর জুলাইয়ের সকল শহীদের হত্যাকাণ্ডের দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে সরকারকে বাধ্য করতে হবে। রাজপথে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের মাধ্যমে আধিপত্যমুক্ত, সার্বভৌম বাংলাদেশ গড়ার সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে। আর সবচেয়ে বড় কথা, যেকোনো সহিংসতা বা ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে সজাগ থাকতে হবে, যা দেশকে আবার অস্থিতিশীল করতে পারে।
শরীফ ওসমান হাদি জীবন দিয়ে প্রমাণ করে গেছেন, আদর্শের কোনো মৃত্যু নেই। তার কণ্ঠ হয়তো থেমে গেছে, কিন্তু তার কথাগুলো আজ কোটি মানুষের স্লোগান। তার দেখানো স্বপ্ন আজ আমাদের সবার চোখে।
আপনি যদি শহীদ হাদির আদর্শে বিশ্বাস করেন, যদি আপনিও একটা ইনসাফভিত্তিক ও সার্বভৌম বাংলাদেশ দেখতে চান, তাহলে এই ভিডিওটি শেয়ার করে ছড়িয়ে দিন। কমেন্টে লিখুন, "বাংলাদেশ গড়তে হলে, হাদির মতো হতে হবে"। আপনার প্রতিটি শেয়ার, প্রতিটি কমেন্ট এই অসমাপ্ত বিপ্লবকে এগিয়ে নেওয়ার এক একটি পদক্ষেপ।

আপনার মতামত লিখুন