বিস্ফোরণে দগ্ধ সেই পরিবারে একে একে প্রাণ গেলো তিনজনের
চট্টগ্রাম নগরীর হালিশহর এলাকায় একটি বাসায় জমে থাকা গ্যাসের বিস্ফোরণে দগ্ধ একই পরিবারের তিনজন সদস্য একে একে মৃত্যুবরণ করেছেন। সর্বশেষ মঙ্গলবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) মারা যান সামির হোসেন (৪০)। এ নিয়ে এই ঘটনায় মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে তিনজনে।
আইসিইউতে শেষ নিঃশ্বাস
রাজধানীর জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউট-এ নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ)-তে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মঙ্গলবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে সামির হোসেনের মৃত্যু হয়। হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, তার শরীরের প্রায় ৪৫ শতাংশ দগ্ধ ছিল। এছাড়া তিনি ইনহেলেশন ইনজুরিতে ভুগছিলেন—অর্থাৎ বিস্ফোরণের সময় অতিরিক্ত ধোঁয়া শ্বাসের মাধ্যমে ফুসফুসে প্রবেশ করায় শ্বাসতন্ত্র মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, দগ্ধ রোগীদের ক্ষেত্রে ইনহেলেশন ইনজুরি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। শরীরের বাইরের ক্ষত ছাড়াও অভ্যন্তরীণ অঙ্গ, বিশেষ করে ফুসফুস আক্রান্ত হলে রোগীর অবস্থা দ্রুত অবনতি ঘটে। সামির হোসেনের ক্ষেত্রেও ঠিক তাই হয়েছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।
আগেই প্রাণ হারান মা ও ছেলে
এর আগে একই ঘটনায় মারা যান নুরজাহান আক্তার রানী এবং তার ছেলে মো. শাওন।
নুরজাহান আক্তারের শরীরের ১০০ শতাংশ দগ্ধ হয়েছিল।
শাওনের শরীরের প্রায় ৫০ শতাংশ পুড়ে যায়।
তাদের দুজনকেই আশঙ্কাজনক অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। তবে দগ্ধের পরিমাণ অত্যন্ত বেশি হওয়ায় চিকিৎসকদের সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা সত্ত্বেও তাদের বাঁচানো সম্ভব হয়নি। পরিবারটির সদস্যরা পরপর মৃত্যুবরণ করায় এলাকাজুড়ে নেমে এসেছে শোকের ছায়া।
কীভাবে ঘটলো বিস্ফোরণ?
প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, বাসার ভেতরে গ্যাস লিকেজ থেকে গ্যাস জমে ছিল। অনেক সময় রান্নাঘরের চুলা, গ্যাসের পাইপলাইন বা সিলিন্ডারের সংযোগস্থলে অদৃশ্য লিকেজ থাকলে দীর্ঘ সময় ধরে ঘরের ভেতরে গ্যাস জমতে থাকে। পরে বৈদ্যুতিক সুইচ অন করা, আগুন জ্বালানো কিংবা সামান্য স্পার্ক থেকেই ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঘরে গ্যাসের গন্ধ পেলে কখনোই বৈদ্যুতিক সুইচ অন বা অফ করা উচিত নয়। দ্রুত জানালা-দরজা খুলে বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা করতে হবে এবং গ্যাসের মূল লাইন বন্ধ করতে হবে। সামান্য অসতর্কতাই বড় দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে।
দগ্ধ রোগীদের চিকিৎসা কতটা জটিল?
বার্ন বিশেষজ্ঞদের মতে, শরীরের ৪০ শতাংশের বেশি দগ্ধ হলে তা জীবন-সংকট তৈরি করতে পারে। আর ৮০ থেকে ১০০ শতাংশ দগ্ধ হলে বেঁচে থাকার সম্ভাবনা খুবই কমে যায়। দগ্ধের পাশাপাশি যদি শ্বাসনালী ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে ঝুঁকি কয়েকগুণ বেড়ে যায়।
দগ্ধ রোগীর চিকিৎসায় দীর্ঘ সময় আইসিইউ সাপোর্ট, সার্জারি, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ এবং নিবিড় পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন হয়। অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসা কয়েক মাস পর্যন্ত চলতে পারে। কিন্তু দগ্ধের মাত্রা বেশি হলে শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ধীরে ধীরে বিকল হয়ে যায়।
এলাকায় শোক ও আতঙ্ক
হালিশহর এলাকায় স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। একই পরিবারের তিনজনের মৃত্যুতে প্রতিবেশীরা গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। তারা বলছেন, কয়েক মুহূর্তের একটি দুর্ঘটনায় একটি পরিবার কার্যত ধ্বংস হয়ে গেল।
স্থানীয়রা গ্যাস লাইনের নিরাপত্তা ও নিয়মিত পরিদর্শনের দাবি জানিয়েছেন। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে বিস্ফোরণের সুনির্দিষ্ট কারণ জানতে তদন্তের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
সচেতনতার প্রয়োজন
এই মর্মান্তিক ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দিল—গ্যাস ব্যবহারে সামান্য অসতর্কতা ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে। নিয়মিত গ্যাস সংযোগ পরীক্ষা, পুরোনো পাইপলাইন পরিবর্তন এবং গ্যাসের গন্ধ পেলেই দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
একটি পরিবারের তিনজন সদস্যের এমন করুণ মৃত্যু পুরো নগরবাসীকেই নাড়িয়ে দিয়েছে। এখন সবার প্রত্যাশা—এই ঘটনার পূর্ণ তদন্ত হোক এবং ভবিষ্যতে যেন আর কোনো পরিবারকে এমন মর্মান্তিক পরিণতির মুখোমুখি হতে না হয়।

বুধবার, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
বিস্ফোরণে দগ্ধ সেই পরিবারে একে একে প্রাণ গেলো তিনজনের
চট্টগ্রাম নগরীর হালিশহর এলাকায় একটি বাসায় জমে থাকা গ্যাসের বিস্ফোরণে দগ্ধ একই পরিবারের তিনজন সদস্য একে একে মৃত্যুবরণ করেছেন। সর্বশেষ মঙ্গলবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) মারা যান সামির হোসেন (৪০)। এ নিয়ে এই ঘটনায় মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে তিনজনে।
আইসিইউতে শেষ নিঃশ্বাস
রাজধানীর জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউট-এ নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ)-তে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মঙ্গলবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে সামির হোসেনের মৃত্যু হয়। হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, তার শরীরের প্রায় ৪৫ শতাংশ দগ্ধ ছিল। এছাড়া তিনি ইনহেলেশন ইনজুরিতে ভুগছিলেন—অর্থাৎ বিস্ফোরণের সময় অতিরিক্ত ধোঁয়া শ্বাসের মাধ্যমে ফুসফুসে প্রবেশ করায় শ্বাসতন্ত্র মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, দগ্ধ রোগীদের ক্ষেত্রে ইনহেলেশন ইনজুরি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। শরীরের বাইরের ক্ষত ছাড়াও অভ্যন্তরীণ অঙ্গ, বিশেষ করে ফুসফুস আক্রান্ত হলে রোগীর অবস্থা দ্রুত অবনতি ঘটে। সামির হোসেনের ক্ষেত্রেও ঠিক তাই হয়েছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।
আগেই প্রাণ হারান মা ও ছেলে
এর আগে একই ঘটনায় মারা যান নুরজাহান আক্তার রানী এবং তার ছেলে মো. শাওন।
নুরজাহান আক্তারের শরীরের ১০০ শতাংশ দগ্ধ হয়েছিল।
শাওনের শরীরের প্রায় ৫০ শতাংশ পুড়ে যায়।
তাদের দুজনকেই আশঙ্কাজনক অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। তবে দগ্ধের পরিমাণ অত্যন্ত বেশি হওয়ায় চিকিৎসকদের সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা সত্ত্বেও তাদের বাঁচানো সম্ভব হয়নি। পরিবারটির সদস্যরা পরপর মৃত্যুবরণ করায় এলাকাজুড়ে নেমে এসেছে শোকের ছায়া।
কীভাবে ঘটলো বিস্ফোরণ?
প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, বাসার ভেতরে গ্যাস লিকেজ থেকে গ্যাস জমে ছিল। অনেক সময় রান্নাঘরের চুলা, গ্যাসের পাইপলাইন বা সিলিন্ডারের সংযোগস্থলে অদৃশ্য লিকেজ থাকলে দীর্ঘ সময় ধরে ঘরের ভেতরে গ্যাস জমতে থাকে। পরে বৈদ্যুতিক সুইচ অন করা, আগুন জ্বালানো কিংবা সামান্য স্পার্ক থেকেই ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঘরে গ্যাসের গন্ধ পেলে কখনোই বৈদ্যুতিক সুইচ অন বা অফ করা উচিত নয়। দ্রুত জানালা-দরজা খুলে বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা করতে হবে এবং গ্যাসের মূল লাইন বন্ধ করতে হবে। সামান্য অসতর্কতাই বড় দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে।
দগ্ধ রোগীদের চিকিৎসা কতটা জটিল?
বার্ন বিশেষজ্ঞদের মতে, শরীরের ৪০ শতাংশের বেশি দগ্ধ হলে তা জীবন-সংকট তৈরি করতে পারে। আর ৮০ থেকে ১০০ শতাংশ দগ্ধ হলে বেঁচে থাকার সম্ভাবনা খুবই কমে যায়। দগ্ধের পাশাপাশি যদি শ্বাসনালী ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে ঝুঁকি কয়েকগুণ বেড়ে যায়।
দগ্ধ রোগীর চিকিৎসায় দীর্ঘ সময় আইসিইউ সাপোর্ট, সার্জারি, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ এবং নিবিড় পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন হয়। অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসা কয়েক মাস পর্যন্ত চলতে পারে। কিন্তু দগ্ধের মাত্রা বেশি হলে শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ধীরে ধীরে বিকল হয়ে যায়।
এলাকায় শোক ও আতঙ্ক
হালিশহর এলাকায় স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। একই পরিবারের তিনজনের মৃত্যুতে প্রতিবেশীরা গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। তারা বলছেন, কয়েক মুহূর্তের একটি দুর্ঘটনায় একটি পরিবার কার্যত ধ্বংস হয়ে গেল।
স্থানীয়রা গ্যাস লাইনের নিরাপত্তা ও নিয়মিত পরিদর্শনের দাবি জানিয়েছেন। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে বিস্ফোরণের সুনির্দিষ্ট কারণ জানতে তদন্তের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
সচেতনতার প্রয়োজন
এই মর্মান্তিক ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দিল—গ্যাস ব্যবহারে সামান্য অসতর্কতা ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে। নিয়মিত গ্যাস সংযোগ পরীক্ষা, পুরোনো পাইপলাইন পরিবর্তন এবং গ্যাসের গন্ধ পেলেই দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
একটি পরিবারের তিনজন সদস্যের এমন করুণ মৃত্যু পুরো নগরবাসীকেই নাড়িয়ে দিয়েছে। এখন সবার প্রত্যাশা—এই ঘটনার পূর্ণ তদন্ত হোক এবং ভবিষ্যতে যেন আর কোনো পরিবারকে এমন মর্মান্তিক পরিণতির মুখোমুখি হতে না হয়।

আপনার মতামত লিখুন