শিক্ষকের এক সিদ্ধান্তে পরীক্ষার হলে মা মেয়ে দুজনেই খুশি
পরীক্ষার হলের পিনপতন নীরবতা। সবার নিঃশ্বাস আটকে আছে কাগজের পাতায়। কিন্তু সেই নিস্তব্ধতাকে চিরে দিয়ে হঠাৎ ভেসে আসছে একটা শিশুর কান্না... তীক্ষ্ণ, অসহায় কান্না। হলের এক কোণায় বসে থাকা একজন মায়ের জন্য সেই কান্না ছিল তার স্বপ্ন ভেঙে যাওয়ার শব্দ। তার চোখ প্রশ্নপত্রের ওপর, কিন্তু মন পড়ে আছে দরজার বাইরে। পরিদর্শকের কঠোর চাহনি বারবার তার দিকে ফিরে আসছে। সময় চলে যাচ্ছে, আর স্বপ্নটাও একটু একটু করে হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে। ভাবুন তো, আপনার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার দিনে যদি এমন হতো, আপনি কী করতেন
এক মায়ের স্বপ্ন
এই গল্পের নায়িকার নাম শিখা। একজন স্ত্রী বা মা নন, তিনি একজন যোদ্ধা। এমন একজন, যিনি পরিস্থিতির সাথে লড়াই করে নিজের একটা নতুন পরিচয় গড়তে চান।
বিয়ের পর পড়াশোনাটা থেমে গিয়েছিল। সংসারের চাপে বইয়ের পাতাগুলো ধুলোর আড়ালে চলে যায়। এরপর তার কোল আলো করে আসে ফুটফুটে কন্যা, মিষ্টি। মিষ্টিকে ঘিরেই শিখার নতুন জগৎ তৈরি হয়। মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়েই শিখা আবার নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন। তিনি শুধু মিষ্টির মা হয়ে থাকতে চাননি, হতে চেয়েছিলেন মেয়ের অনুপ্রেরণা।
শিখা সিদ্ধান্ত নিলেন, তিনি তার থেমে যাওয়া পড়াশোনা আবার শুরু করবেন। দিনের বেলা সংসারের সব কাজ, মেয়ের যত্ন, আর রাতের নিস্তব্ধতায় বই নিয়ে বসা—এটাই হয়ে উঠেছিল তার রুটিন। স্বামী পাশে থেকে সাহস জুগিয়েছেন। কিন্তু আশেপাশের মানুষের বাঁকা কথা তো থামেনি। "এতদিন পর আবার পড়াশোনার শখ কেন?", "সংসার ছেড়ে পরীক্ষা দেওয়ার কী দরকার?"—এসব কথায় কান দেননি শিখা। তার একটাই লক্ষ্য ছিল—নিজেকে প্রমাণ করা। এই পরীক্ষাটা তার কাছে শুধু একটা সার্টিফিকেট ছিল না, ছিল নিজের আত্মবিশ্বাস ফিরে পাওয়ার লড়াই, ছিল তার মেয়ের জন্য একটা ভালো ভবিষ্যতের দরজা খুলে দেওয়ার চাবিকাঠি।
প্রতি রাতে যখন মিষ্টি তার বুকে ঘুমিয়ে থাকত, শিখা তখন জেগে থাকতেন বইয়ের পাতায়। মেয়ের কপালে আলতো চুমু খেয়ে মনে মনে বলতেন, "মা, তোর জন্যই তো এই লড়াই। আমি এমন কিছু হতে চাই যেন তুই বড় হয়ে বলতে পারিস, আমার মা একজন শিক্ষিত, স্বাবলম্বী নারী।" প্রতিটি অধ্যায় শেষ করার সাথে সাথে তার আত্মবিশ্বাস বাড়ত। তিনি শুধু সিলেবাস পড়ছিলেন না, পড়ছিলেন জীবনের নতুন মানে। এই পরীক্ষা পাশ করলে একটা চাকরির সুযোগ হবে, সংসারে স্বচ্ছলতা আসবে, আর সবচেয়ে বড় কথা, তিনি মিষ্টিকে একটা উন্নত জীবন দিতে পারবেন। এই স্বপ্ন নিয়েই তিনি পরীক্ষার ফর্ম পূরণ করেছিলেন। তার প্রতিটি নির্ঘুম রাত আর ত্যাগ আজ এই তিন ঘণ্টার পরীক্ষার ওপর নির্ভর করছে।
১: পরীক্ষার দিনের উদ্বেগ
অবশেষে সেই দিনটা এলো। পরীক্ষার দিন। সকাল থেকেই বুকের ভেতরটা ধুকপুক করছিল। এটা শুধু পরীক্ষার টেনশন ছিল না, এর সাথে মিশে ছিল তার আট মাসের শিশু মিষ্টিকে নিয়ে চিন্তা। মেয়েকে ছাড়া তিনি এক মুহূর্তও থাকেননি। শাশুড়ি সঙ্গে এসেছেন, কথা দিয়েছেন মিষ্টিকে সামলে রাখবেন। কিন্তু মায়ের মন কি আর মানে!
পরীক্ষা কেন্দ্রের গেটের সামনে দাঁড়িয়ে শিখা শেষবারের মতো মেয়েকে কোলে তুলে নিলেন। মিষ্টির নরম গালে চুমু খেয়ে বুকে চেপে ধরলেন। মেয়ের শরীরের চেনা গন্ধটা যেন তার সব ভয় দূর করে দিচ্ছিল। শাশুড়ি তাড়া দিয়ে বললেন, "বউমা, আর দেরি কোরো না। ভেতরে যাও। আমি ওকে দেখছি।"
অনিচ্ছা সত্ত্বেও শিখা মেয়েকে শাশুড়ির কোলে দিলেন। কিন্তু যেই না তিনি হলের দিকে পা বাড়িয়েছেন, মিষ্টি চারপাশ কাঁপিয়ে কেঁদে উঠল। মায়ের কোলছাড়া হয়ে সে যেন সব আশ্রয় হারিয়ে ফেলেছে। শিখা ফিরে এসে আবার কোলে নিতেই কান্না উধাও। মায়ের বুকের ওমে সে একেবারে শান্ত। কয়েকবার এমন হলো। যখনই শিখা তাকে ছাড়ছেন, তখনই বুকফাটা কান্না। আর কোলে নিলেই সব চুপ।
শিখার চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছিল। একদিকে তার বছরের পর বছরের প্রস্তুতি আর স্বপ্ন। অন্যদিকে, সন্তানের অসহায় কান্না। সময় গড়িয়ে যাচ্ছে। পরীক্ষা শুরুর ঘণ্টা বেজে গেল। একরকম জোর করেই নিজেকে সামলে শিখা হলের ভেতরে ঢুকলেন। পেছনে তখনো বেজে চলেছে মিষ্টির কান্নার সুর, যা তার বুকে ছুরির মতো বিঁধছিল।
হলে নিজের আসনে বসে শিখার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসছিল। তিনি প্রশ্নপত্র হাতে নিলেন, কিন্তু একটা অক্ষরও মাথায় ঢুকছিল না। তার সব মনোযোগ পড়ে আছে হলের বাইরে, যেখানে তার সন্তান কাঁদছে। তিনি কান পেতে থাকলেন। কান্নার আওয়াজটা একটু থামলেই ভাবতেন, এই বুঝি মিষ্টি ঘুমিয়ে পড়েছে। কিন্তু পরক্ষণেই আবার কান্নার রোল উঠছিল। শিখার মনে হচ্ছিল, প্রতিটি কান্না তার স্বপ্নকে একটু একটু করে ভেঙে দিচ্ছে। তিনি কলম হাতে উত্তর লেখার চেষ্টা করছিলেন, কিন্তু হাত কাঁপছিল। চোখের সামনে ভাসছিল শুধু মিষ্টির ভেজা মুখটা।
২: সমস্যার তীব্রতা ও পরিদর্শকের ভূমিকা
পরীক্ষার হলের দায়িত্বে ছিলেন করিম সাহেব। অত্যন্ত নিয়মনিষ্ঠ আর কড়া শিক্ষক হিসেবে তার নামডাক আছে। তিনি ধীর পায়ে হলের এপাশ-ওপাশ করছিলেন। তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি কেউ এড়াতে পারছিল না। হলের পিনপতন নীরবতার মাঝে বাইরের কান্নার আওয়াজটা তার কানেও আসছিল। প্রথমে তিনি বিষয়টাকে গুরুত্ব দেননি। পরীক্ষা কেন্দ্রের বাইরে এমন ঘটনা ঘটেই থাকে।
কিন্তু সময় যত যাচ্ছিল, কান্নার তীব্রতা ততই বাড়ছিল। অন্য পরীক্ষার্থীরাও বারবার দরজার দিকে তাকাচ্ছিল, তাদের মনোযোগ নষ্ট হচ্ছিল। করিম সাহেব কয়েকবার দরজার কাছে গিয়ে বাইরে উঁকি দিলেন। দেখলেন, একজন বয়স্ক মহিলা একটা শিশুকে সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন।
শিখার অবস্থা তখন সবচেয়ে খারাপ। তিনি আর পারছিলেন না। মনে হচ্ছিল, এই তিন ঘণ্টা যেন তিন যুগের সমান। কান্নার শব্দটা তার মাথায় হাতুড়ির মতো বাড়ি দিচ্ছিল। প্রশ্নপত্রের দিকে তাকিয়ে উত্তর ভাবার চেষ্টা করছিলেন, কিন্তু সব গুলিয়ে যাচ্ছিল। যা কিছু পড়ে এসেছিলেন, কিছুই মনে করতে পারছিলেন না। তার চোখ ঝাপসা হয়ে এলো। কয়েক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল তার উত্তরপত্রের ওপর।
করিম সাহেবের চোখে পড়ল, কোণায় বসা মেয়েটি কাঁদছে। তিনি কঠোর পায়ে তার দিকে এগিয়ে গেলেন। কাছে এসে নিচু কিন্তু firme গলায় বললেন, "এখানে কান্নাকাটি করা নিষেধ। এটা পরীক্ষার হল, নাটক করার জায়গা না। পরীক্ষা দাও।"
শিখা চমকে উঠে চোখ মুছলেন। কাঁপা কাঁপা গলায় বললেন, "স্যার, বাইরে আমার বাচ্চাটা কাঁদছে। আমি..."
করিম সাহেব তাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, "সেটা তোমার সমস্যা। পরীক্ষার নিয়ম সবার জন্য এক। বাচ্চাকে বাইরে রেখে আসতে হয়, এটা জেনেই তো এসেছো। এখন এসব বলে সময় নষ্ট কোরো না।"
কথাগুলো বলে করিম সাহেব নিজের জায়গায় ফিরে গেলেন। তার কথায় কোনো নরম সুর ছিল না, ছিল শুধু নিয়মের ধার। শিখার সব আশা যেন নিভে গেল। তিনি বুঝতে পারলেন, এই অবস্থায় তার পক্ষে পরীক্ষা দেওয়া সম্ভব না। তার এতদিনের পরিশ্রম, স্বপ্ন, মেয়ের ভবিষ্যৎ—সবকিছু যেন তার চোখের সামনে ভেঙে গুঁড়িয়ে যাচ্ছে। তিনি কলমটা রেখে দিয়ে নিঃশব্দে কাঁদতে লাগলেন। তার মনে হচ্ছিল, একজন মা হওয়ার 'অপরাধেই' তার সব স্বপ্ন শেষ হয়ে গেল।
প্রায় এক ঘণ্টা কেটে গেছে। শিখা তার উত্তরপত্রে একটা শব্দও লিখতে পারেননি। তিনি হাল ছেড়ে দিয়েছেন। ঠিক করলেন, পরীক্ষা ছেড়ে বেরিয়ে যাবেন। সন্তানের কান্নার চেয়ে বড় কোনো পরীক্ষা তার কাছে নেই। তিনি উঠে দাঁড়ানোর জন্য মনকে শক্ত করলেন। তার ভেতরের সব জোর যেন ফুরিয়ে গেছে। স্বপ্নভঙ্গের যন্ত্রণা তার মুখে স্পষ্ট।
করিম সাহেব দূর থেকে শিখাকে দেখছিলেন। তিনি মেয়েটির অসহায়ত্ব বুঝতে পারছিলেন। কঠোরতার আড়ালে তিনি নিজেও একজন বাবা। তিনি জানেন, সন্তানের জন্য মায়ের মন কতটা ব্যাকুল হয়। তিনি মেয়েটির কান্নার মধ্যে আর নিয়মভঙ্গ দেখছিলেন না, দেখছিলেন একজন মায়ের অসহায় আত্মসমর্পণ। তার মনে একটা দ্বন্দ্ব শুরু হলো। একদিকে তার দীর্ঘদিনের নিয়ম আর শৃঙ্খলা, অন্যদিকে এক মায়ের প্রতি মানবিকতা। নিয়ম বলে, হলের ভেতর শিশু আনা যাবে না। কিন্তু তার বিবেক বলছিল, এই নিয়ম কি একজন মায়ের স্বপ্নের চেয়েও বড়?
তিনি দেখলেন, শিখা প্রায় উঠে দাঁড়িয়েছেন। তার চোখ লাল, মুখটা পরাজয়ের কষ্টে মলিন। এই দৃশ্যটা করিম সাহেবের বুকে গিয়ে লাগল। তিনি ভাবলেন, আজ যদি তিনি শুধু নিয়মকেই আঁকড়ে ধরে থাকেন, তাহলে একজন মায়ের স্বপ্ন হয়তো চিরদিনের জন্য শেষ হয়ে যাবে। তিনি হয়তো তার দায়িত্ব পালন করবেন, কিন্তু একজন মানুষ হিসেবে নিজেকে ক্ষমা করতে পারবেন না।
পুরো হলে একটা থমথমে নীরবতা। সবাই শিখার দিকে তাকিয়ে। শিখা যখন খাতা জমা দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য পা বাড়াবেন, ঠিক তখনই করিম সাহেবের কণ্ঠস্বর ভেসে এলো।
"দাঁড়াও।"
শিখা থেমে গেলেন। ভাবলেন, হয়তো পরিদর্শক তাকে শেষবারের মতো বকা দেওয়ার জন্য ডাকছেন।
করিম সাহেব ধীর পায়ে তার দিকে এগিয়ে এলেন। তারপর যা করলেন, তা ছিল অকল্পনীয়। তিনি দরজার কাছে দাঁড়ানো একজন সহকারীকে ইশারা করলেন। শান্ত গলায় বললেন, "বাইরে যে বাচ্চাটা কাঁদছে, ওকে ওর মায়ের কাছে নিয়ে আসুন।"
সমাধান: মানবতার জয়
করিম সাহেবের কথায় পুরো হল বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে গেল। শিখা নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। তিনি অবাক হয়ে করিম সাহেবের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
সহকারী শিক্ষক দ্রুত বাইরে গিয়ে মিষ্টিকে কোলে করে ভেতরে নিয়ে এলেন। শিশুটি তখনো ফুঁপিয়ে কাঁদছিল। কিন্তু যেই না তার চোখ মায়ের ওপর পড়ল, সে যেন সব কষ্ট ভুলে গেল। শিখা ছুটে গিয়ে মেয়েকে কোলে তুলে নিলেন। মিষ্টি তার মায়ের বুকে মুখ গুঁজে দিয়ে সঙ্গে সঙ্গে শান্ত হয়ে গেল। সেই বুকফাটা কান্না থেমে গিয়ে এক পরম নিশ্চিন্তে তার ছোট্ট শরীরটা মায়ের কোলে এলিয়ে পড়ল।
করিম সাহেব শিখার কাছে এসে বললেন, "কান্না থামাও। তোমার জন্য একটা চেয়ার দিচ্ছি। তুমি এই কোণায় বসে মেয়েকে কোলে নিয়েই পরীক্ষা দাও। মনে রাখবে, একজন মায়ের সংগ্রামকে সম্মান জানানোর চেয়ে বড় কোনো নিয়ম নেই।"
শিখার মুখ দিয়ে কোনো কথা বেরোচ্ছিল না। তিনি শুধু কৃতজ্ঞতার অশ্রুভরা চোখে করিম সাহেবের দিকে তাকিয়ে রইলেন। হলের অন্য পরীক্ষার্থীদের চোখেও তখন স্বস্তি। তারা সবাই নীরবে এই মানবিক দৃশ্যের সাক্ষী হলো।
এরপরের দুই ঘণ্টা এক অসাধারণ ছবির জন্ম দিল। একদিকে মা মন দিয়ে উত্তর লিখে চলেছেন, আর তার কোলে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে তার ছোট্ট মেয়ে। শিখার কলম আর থামেনি। তার সব ভয়, সব চিন্তা দূর হয়ে গিয়েছিল। মায়ের কোল ফিরে পেয়ে মিষ্টিও আর কোনো ঝামেলা করেনি। সে শুধু মায়ের শরীরের উষ্ণতায় নিজেকে গুটিয়ে রেখেছিল। শিখা তার জীবনের সেরা পরীক্ষাটা দিলেন
পরীক্ষা শেষে শিখা যখন খাতা জমা দিতে গেলেন, করিম সাহেব তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন। শিখা কাঁপা কাঁপা গলায় বললেন, "স্যার, আমি আপনার এই ঋণ কোনোদিন শোধ করতে পারব না।"
করিম সাহেব উত্তর দিলেন, "এটা কোনো ঋণ নয়, মা। এটা আমার দায়িত্ব ছিল। একজন শিক্ষক হিসেবে শুধু নিয়ম শেখানোই আমার কাজ নয়, মনুষ্যত্ব শেখানোও আমার কর্তব্য। তুমি তোমার মেয়ের জন্য যে লড়াইটা করছো, আমি তাকে সম্মান জানাই।"
পরীক্ষার হল থেকে বেরিয়ে আসার সময় শিখার মুখে ছিল একরাশ তৃপ্তি। তার কোলে শান্তিতে ঘুমিয়ে ছিল তার মেয়ে মিষ্টি। মা-মেয়ে দুজনেই যেন আজ একসাথে পরীক্ষায় পাশ করেছে। একজন পাশ করেছে নিজের স্বপ্নের পরীক্ষায়, আর অন্যজন পাশ করেছে মায়ের ভালোবাসার আশ্রয়ের পরীক্ষায়।
এই ঘটনাটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, নিয়মের ওপরেও মানবতা থাকে। একজন শিক্ষকের একটি মানবিক সিদ্ধান্ত সেদিন শুধু একজন মায়ের স্বপ্নকেই বাঁচায়নি, বরং প্রমাণ করে দিয়েছে যে পৃথিবীতে মনুষ্যত্ব এখনো মরে যায়নি।
আপনার জীবনেও কি এমন কোনো মানবিক ঘটনা ঘটেছে যা আপনার মনে দাগ কেটে গেছে? আমাদের কমেন্টে জানান। যদি আপনার হৃদয় ছুঁয়ে যায়, তবে প্রিয়জনদের সাথে শেয়ার করতে ভুলবেন না। আর এমন আরও মানবিক গল্পের জন্য আমাদের চ্যানেলের সাথে যুক্ত থাকুন ধন্যবাদ

বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারি ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১১ জানুয়ারি ২০২৬
শিক্ষকের এক সিদ্ধান্তে পরীক্ষার হলে মা মেয়ে দুজনেই খুশি
পরীক্ষার হলের পিনপতন নীরবতা। সবার নিঃশ্বাস আটকে আছে কাগজের পাতায়। কিন্তু সেই নিস্তব্ধতাকে চিরে দিয়ে হঠাৎ ভেসে আসছে একটা শিশুর কান্না... তীক্ষ্ণ, অসহায় কান্না। হলের এক কোণায় বসে থাকা একজন মায়ের জন্য সেই কান্না ছিল তার স্বপ্ন ভেঙে যাওয়ার শব্দ। তার চোখ প্রশ্নপত্রের ওপর, কিন্তু মন পড়ে আছে দরজার বাইরে। পরিদর্শকের কঠোর চাহনি বারবার তার দিকে ফিরে আসছে। সময় চলে যাচ্ছে, আর স্বপ্নটাও একটু একটু করে হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে। ভাবুন তো, আপনার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার দিনে যদি এমন হতো, আপনি কী করতেন
এক মায়ের স্বপ্ন
এই গল্পের নায়িকার নাম শিখা। একজন স্ত্রী বা মা নন, তিনি একজন যোদ্ধা। এমন একজন, যিনি পরিস্থিতির সাথে লড়াই করে নিজের একটা নতুন পরিচয় গড়তে চান।
বিয়ের পর পড়াশোনাটা থেমে গিয়েছিল। সংসারের চাপে বইয়ের পাতাগুলো ধুলোর আড়ালে চলে যায়। এরপর তার কোল আলো করে আসে ফুটফুটে কন্যা, মিষ্টি। মিষ্টিকে ঘিরেই শিখার নতুন জগৎ তৈরি হয়। মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়েই শিখা আবার নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন। তিনি শুধু মিষ্টির মা হয়ে থাকতে চাননি, হতে চেয়েছিলেন মেয়ের অনুপ্রেরণা।
শিখা সিদ্ধান্ত নিলেন, তিনি তার থেমে যাওয়া পড়াশোনা আবার শুরু করবেন। দিনের বেলা সংসারের সব কাজ, মেয়ের যত্ন, আর রাতের নিস্তব্ধতায় বই নিয়ে বসা—এটাই হয়ে উঠেছিল তার রুটিন। স্বামী পাশে থেকে সাহস জুগিয়েছেন। কিন্তু আশেপাশের মানুষের বাঁকা কথা তো থামেনি। "এতদিন পর আবার পড়াশোনার শখ কেন?", "সংসার ছেড়ে পরীক্ষা দেওয়ার কী দরকার?"—এসব কথায় কান দেননি শিখা। তার একটাই লক্ষ্য ছিল—নিজেকে প্রমাণ করা। এই পরীক্ষাটা তার কাছে শুধু একটা সার্টিফিকেট ছিল না, ছিল নিজের আত্মবিশ্বাস ফিরে পাওয়ার লড়াই, ছিল তার মেয়ের জন্য একটা ভালো ভবিষ্যতের দরজা খুলে দেওয়ার চাবিকাঠি।
প্রতি রাতে যখন মিষ্টি তার বুকে ঘুমিয়ে থাকত, শিখা তখন জেগে থাকতেন বইয়ের পাতায়। মেয়ের কপালে আলতো চুমু খেয়ে মনে মনে বলতেন, "মা, তোর জন্যই তো এই লড়াই। আমি এমন কিছু হতে চাই যেন তুই বড় হয়ে বলতে পারিস, আমার মা একজন শিক্ষিত, স্বাবলম্বী নারী।" প্রতিটি অধ্যায় শেষ করার সাথে সাথে তার আত্মবিশ্বাস বাড়ত। তিনি শুধু সিলেবাস পড়ছিলেন না, পড়ছিলেন জীবনের নতুন মানে। এই পরীক্ষা পাশ করলে একটা চাকরির সুযোগ হবে, সংসারে স্বচ্ছলতা আসবে, আর সবচেয়ে বড় কথা, তিনি মিষ্টিকে একটা উন্নত জীবন দিতে পারবেন। এই স্বপ্ন নিয়েই তিনি পরীক্ষার ফর্ম পূরণ করেছিলেন। তার প্রতিটি নির্ঘুম রাত আর ত্যাগ আজ এই তিন ঘণ্টার পরীক্ষার ওপর নির্ভর করছে।
১: পরীক্ষার দিনের উদ্বেগ
অবশেষে সেই দিনটা এলো। পরীক্ষার দিন। সকাল থেকেই বুকের ভেতরটা ধুকপুক করছিল। এটা শুধু পরীক্ষার টেনশন ছিল না, এর সাথে মিশে ছিল তার আট মাসের শিশু মিষ্টিকে নিয়ে চিন্তা। মেয়েকে ছাড়া তিনি এক মুহূর্তও থাকেননি। শাশুড়ি সঙ্গে এসেছেন, কথা দিয়েছেন মিষ্টিকে সামলে রাখবেন। কিন্তু মায়ের মন কি আর মানে!
পরীক্ষা কেন্দ্রের গেটের সামনে দাঁড়িয়ে শিখা শেষবারের মতো মেয়েকে কোলে তুলে নিলেন। মিষ্টির নরম গালে চুমু খেয়ে বুকে চেপে ধরলেন। মেয়ের শরীরের চেনা গন্ধটা যেন তার সব ভয় দূর করে দিচ্ছিল। শাশুড়ি তাড়া দিয়ে বললেন, "বউমা, আর দেরি কোরো না। ভেতরে যাও। আমি ওকে দেখছি।"
অনিচ্ছা সত্ত্বেও শিখা মেয়েকে শাশুড়ির কোলে দিলেন। কিন্তু যেই না তিনি হলের দিকে পা বাড়িয়েছেন, মিষ্টি চারপাশ কাঁপিয়ে কেঁদে উঠল। মায়ের কোলছাড়া হয়ে সে যেন সব আশ্রয় হারিয়ে ফেলেছে। শিখা ফিরে এসে আবার কোলে নিতেই কান্না উধাও। মায়ের বুকের ওমে সে একেবারে শান্ত। কয়েকবার এমন হলো। যখনই শিখা তাকে ছাড়ছেন, তখনই বুকফাটা কান্না। আর কোলে নিলেই সব চুপ।
শিখার চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছিল। একদিকে তার বছরের পর বছরের প্রস্তুতি আর স্বপ্ন। অন্যদিকে, সন্তানের অসহায় কান্না। সময় গড়িয়ে যাচ্ছে। পরীক্ষা শুরুর ঘণ্টা বেজে গেল। একরকম জোর করেই নিজেকে সামলে শিখা হলের ভেতরে ঢুকলেন। পেছনে তখনো বেজে চলেছে মিষ্টির কান্নার সুর, যা তার বুকে ছুরির মতো বিঁধছিল।
হলে নিজের আসনে বসে শিখার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসছিল। তিনি প্রশ্নপত্র হাতে নিলেন, কিন্তু একটা অক্ষরও মাথায় ঢুকছিল না। তার সব মনোযোগ পড়ে আছে হলের বাইরে, যেখানে তার সন্তান কাঁদছে। তিনি কান পেতে থাকলেন। কান্নার আওয়াজটা একটু থামলেই ভাবতেন, এই বুঝি মিষ্টি ঘুমিয়ে পড়েছে। কিন্তু পরক্ষণেই আবার কান্নার রোল উঠছিল। শিখার মনে হচ্ছিল, প্রতিটি কান্না তার স্বপ্নকে একটু একটু করে ভেঙে দিচ্ছে। তিনি কলম হাতে উত্তর লেখার চেষ্টা করছিলেন, কিন্তু হাত কাঁপছিল। চোখের সামনে ভাসছিল শুধু মিষ্টির ভেজা মুখটা।
২: সমস্যার তীব্রতা ও পরিদর্শকের ভূমিকা
পরীক্ষার হলের দায়িত্বে ছিলেন করিম সাহেব। অত্যন্ত নিয়মনিষ্ঠ আর কড়া শিক্ষক হিসেবে তার নামডাক আছে। তিনি ধীর পায়ে হলের এপাশ-ওপাশ করছিলেন। তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি কেউ এড়াতে পারছিল না। হলের পিনপতন নীরবতার মাঝে বাইরের কান্নার আওয়াজটা তার কানেও আসছিল। প্রথমে তিনি বিষয়টাকে গুরুত্ব দেননি। পরীক্ষা কেন্দ্রের বাইরে এমন ঘটনা ঘটেই থাকে।
কিন্তু সময় যত যাচ্ছিল, কান্নার তীব্রতা ততই বাড়ছিল। অন্য পরীক্ষার্থীরাও বারবার দরজার দিকে তাকাচ্ছিল, তাদের মনোযোগ নষ্ট হচ্ছিল। করিম সাহেব কয়েকবার দরজার কাছে গিয়ে বাইরে উঁকি দিলেন। দেখলেন, একজন বয়স্ক মহিলা একটা শিশুকে সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন।
শিখার অবস্থা তখন সবচেয়ে খারাপ। তিনি আর পারছিলেন না। মনে হচ্ছিল, এই তিন ঘণ্টা যেন তিন যুগের সমান। কান্নার শব্দটা তার মাথায় হাতুড়ির মতো বাড়ি দিচ্ছিল। প্রশ্নপত্রের দিকে তাকিয়ে উত্তর ভাবার চেষ্টা করছিলেন, কিন্তু সব গুলিয়ে যাচ্ছিল। যা কিছু পড়ে এসেছিলেন, কিছুই মনে করতে পারছিলেন না। তার চোখ ঝাপসা হয়ে এলো। কয়েক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল তার উত্তরপত্রের ওপর।
করিম সাহেবের চোখে পড়ল, কোণায় বসা মেয়েটি কাঁদছে। তিনি কঠোর পায়ে তার দিকে এগিয়ে গেলেন। কাছে এসে নিচু কিন্তু firme গলায় বললেন, "এখানে কান্নাকাটি করা নিষেধ। এটা পরীক্ষার হল, নাটক করার জায়গা না। পরীক্ষা দাও।"
শিখা চমকে উঠে চোখ মুছলেন। কাঁপা কাঁপা গলায় বললেন, "স্যার, বাইরে আমার বাচ্চাটা কাঁদছে। আমি..."
করিম সাহেব তাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, "সেটা তোমার সমস্যা। পরীক্ষার নিয়ম সবার জন্য এক। বাচ্চাকে বাইরে রেখে আসতে হয়, এটা জেনেই তো এসেছো। এখন এসব বলে সময় নষ্ট কোরো না।"
কথাগুলো বলে করিম সাহেব নিজের জায়গায় ফিরে গেলেন। তার কথায় কোনো নরম সুর ছিল না, ছিল শুধু নিয়মের ধার। শিখার সব আশা যেন নিভে গেল। তিনি বুঝতে পারলেন, এই অবস্থায় তার পক্ষে পরীক্ষা দেওয়া সম্ভব না। তার এতদিনের পরিশ্রম, স্বপ্ন, মেয়ের ভবিষ্যৎ—সবকিছু যেন তার চোখের সামনে ভেঙে গুঁড়িয়ে যাচ্ছে। তিনি কলমটা রেখে দিয়ে নিঃশব্দে কাঁদতে লাগলেন। তার মনে হচ্ছিল, একজন মা হওয়ার 'অপরাধেই' তার সব স্বপ্ন শেষ হয়ে গেল।
প্রায় এক ঘণ্টা কেটে গেছে। শিখা তার উত্তরপত্রে একটা শব্দও লিখতে পারেননি। তিনি হাল ছেড়ে দিয়েছেন। ঠিক করলেন, পরীক্ষা ছেড়ে বেরিয়ে যাবেন। সন্তানের কান্নার চেয়ে বড় কোনো পরীক্ষা তার কাছে নেই। তিনি উঠে দাঁড়ানোর জন্য মনকে শক্ত করলেন। তার ভেতরের সব জোর যেন ফুরিয়ে গেছে। স্বপ্নভঙ্গের যন্ত্রণা তার মুখে স্পষ্ট।
করিম সাহেব দূর থেকে শিখাকে দেখছিলেন। তিনি মেয়েটির অসহায়ত্ব বুঝতে পারছিলেন। কঠোরতার আড়ালে তিনি নিজেও একজন বাবা। তিনি জানেন, সন্তানের জন্য মায়ের মন কতটা ব্যাকুল হয়। তিনি মেয়েটির কান্নার মধ্যে আর নিয়মভঙ্গ দেখছিলেন না, দেখছিলেন একজন মায়ের অসহায় আত্মসমর্পণ। তার মনে একটা দ্বন্দ্ব শুরু হলো। একদিকে তার দীর্ঘদিনের নিয়ম আর শৃঙ্খলা, অন্যদিকে এক মায়ের প্রতি মানবিকতা। নিয়ম বলে, হলের ভেতর শিশু আনা যাবে না। কিন্তু তার বিবেক বলছিল, এই নিয়ম কি একজন মায়ের স্বপ্নের চেয়েও বড়?
তিনি দেখলেন, শিখা প্রায় উঠে দাঁড়িয়েছেন। তার চোখ লাল, মুখটা পরাজয়ের কষ্টে মলিন। এই দৃশ্যটা করিম সাহেবের বুকে গিয়ে লাগল। তিনি ভাবলেন, আজ যদি তিনি শুধু নিয়মকেই আঁকড়ে ধরে থাকেন, তাহলে একজন মায়ের স্বপ্ন হয়তো চিরদিনের জন্য শেষ হয়ে যাবে। তিনি হয়তো তার দায়িত্ব পালন করবেন, কিন্তু একজন মানুষ হিসেবে নিজেকে ক্ষমা করতে পারবেন না।
পুরো হলে একটা থমথমে নীরবতা। সবাই শিখার দিকে তাকিয়ে। শিখা যখন খাতা জমা দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য পা বাড়াবেন, ঠিক তখনই করিম সাহেবের কণ্ঠস্বর ভেসে এলো।
"দাঁড়াও।"
শিখা থেমে গেলেন। ভাবলেন, হয়তো পরিদর্শক তাকে শেষবারের মতো বকা দেওয়ার জন্য ডাকছেন।
করিম সাহেব ধীর পায়ে তার দিকে এগিয়ে এলেন। তারপর যা করলেন, তা ছিল অকল্পনীয়। তিনি দরজার কাছে দাঁড়ানো একজন সহকারীকে ইশারা করলেন। শান্ত গলায় বললেন, "বাইরে যে বাচ্চাটা কাঁদছে, ওকে ওর মায়ের কাছে নিয়ে আসুন।"
সমাধান: মানবতার জয়
করিম সাহেবের কথায় পুরো হল বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে গেল। শিখা নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। তিনি অবাক হয়ে করিম সাহেবের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
সহকারী শিক্ষক দ্রুত বাইরে গিয়ে মিষ্টিকে কোলে করে ভেতরে নিয়ে এলেন। শিশুটি তখনো ফুঁপিয়ে কাঁদছিল। কিন্তু যেই না তার চোখ মায়ের ওপর পড়ল, সে যেন সব কষ্ট ভুলে গেল। শিখা ছুটে গিয়ে মেয়েকে কোলে তুলে নিলেন। মিষ্টি তার মায়ের বুকে মুখ গুঁজে দিয়ে সঙ্গে সঙ্গে শান্ত হয়ে গেল। সেই বুকফাটা কান্না থেমে গিয়ে এক পরম নিশ্চিন্তে তার ছোট্ট শরীরটা মায়ের কোলে এলিয়ে পড়ল।
করিম সাহেব শিখার কাছে এসে বললেন, "কান্না থামাও। তোমার জন্য একটা চেয়ার দিচ্ছি। তুমি এই কোণায় বসে মেয়েকে কোলে নিয়েই পরীক্ষা দাও। মনে রাখবে, একজন মায়ের সংগ্রামকে সম্মান জানানোর চেয়ে বড় কোনো নিয়ম নেই।"
শিখার মুখ দিয়ে কোনো কথা বেরোচ্ছিল না। তিনি শুধু কৃতজ্ঞতার অশ্রুভরা চোখে করিম সাহেবের দিকে তাকিয়ে রইলেন। হলের অন্য পরীক্ষার্থীদের চোখেও তখন স্বস্তি। তারা সবাই নীরবে এই মানবিক দৃশ্যের সাক্ষী হলো।
এরপরের দুই ঘণ্টা এক অসাধারণ ছবির জন্ম দিল। একদিকে মা মন দিয়ে উত্তর লিখে চলেছেন, আর তার কোলে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে তার ছোট্ট মেয়ে। শিখার কলম আর থামেনি। তার সব ভয়, সব চিন্তা দূর হয়ে গিয়েছিল। মায়ের কোল ফিরে পেয়ে মিষ্টিও আর কোনো ঝামেলা করেনি। সে শুধু মায়ের শরীরের উষ্ণতায় নিজেকে গুটিয়ে রেখেছিল। শিখা তার জীবনের সেরা পরীক্ষাটা দিলেন
পরীক্ষা শেষে শিখা যখন খাতা জমা দিতে গেলেন, করিম সাহেব তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন। শিখা কাঁপা কাঁপা গলায় বললেন, "স্যার, আমি আপনার এই ঋণ কোনোদিন শোধ করতে পারব না।"
করিম সাহেব উত্তর দিলেন, "এটা কোনো ঋণ নয়, মা। এটা আমার দায়িত্ব ছিল। একজন শিক্ষক হিসেবে শুধু নিয়ম শেখানোই আমার কাজ নয়, মনুষ্যত্ব শেখানোও আমার কর্তব্য। তুমি তোমার মেয়ের জন্য যে লড়াইটা করছো, আমি তাকে সম্মান জানাই।"
পরীক্ষার হল থেকে বেরিয়ে আসার সময় শিখার মুখে ছিল একরাশ তৃপ্তি। তার কোলে শান্তিতে ঘুমিয়ে ছিল তার মেয়ে মিষ্টি। মা-মেয়ে দুজনেই যেন আজ একসাথে পরীক্ষায় পাশ করেছে। একজন পাশ করেছে নিজের স্বপ্নের পরীক্ষায়, আর অন্যজন পাশ করেছে মায়ের ভালোবাসার আশ্রয়ের পরীক্ষায়।
এই ঘটনাটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, নিয়মের ওপরেও মানবতা থাকে। একজন শিক্ষকের একটি মানবিক সিদ্ধান্ত সেদিন শুধু একজন মায়ের স্বপ্নকেই বাঁচায়নি, বরং প্রমাণ করে দিয়েছে যে পৃথিবীতে মনুষ্যত্ব এখনো মরে যায়নি।
আপনার জীবনেও কি এমন কোনো মানবিক ঘটনা ঘটেছে যা আপনার মনে দাগ কেটে গেছে? আমাদের কমেন্টে জানান। যদি আপনার হৃদয় ছুঁয়ে যায়, তবে প্রিয়জনদের সাথে শেয়ার করতে ভুলবেন না। আর এমন আরও মানবিক গল্পের জন্য আমাদের চ্যানেলের সাথে যুক্ত থাকুন ধন্যবাদ

আপনার মতামত লিখুন